SIR impact
Bengal Liberty: মস্ত অফিসার বা বিদেশে থাকা সন্তানের সুবিশাল ফ্ল্যাটে যখন বৃদ্ধ মা-বাবারা ঠাই পায় না। অগত্যা তখন তাঁদের ঠিকানা হয় ‘বৃদ্ধাশ্রম’। একসময় ছোট্ট খোকা ভয় পেয়ে নিশ্চিন্তে আশ্রয় নিত মায়ের কোলে বা বাবার বুকে। এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর আবারও বৃদ্ধ বাবা-মা সহায় পেতে সেই তথাকথিত এস্টাব্লিশ খোকারা পৌঁছে যাচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমের দশ ফুট বাই বারো ফুটের ঘরে।

কালচক্রে দিনবদল (SIR)
জীবনের ওঠাপড়া থেকে ব্রাত্য হয়ে যাওয়া বাবা-মা’র পরিচয় যাদের কাছে স্রেফ ‘নিয়মরক্ষা’ বলে মনে করতেন। তারাই এখন নিজের ভোট দেওয়ার অধিকার জিইয়ে রাখতে ভোটার তালিকায় বাবা-মায়ের নাম খুঁজছেন। কেউ কেউ আবার বাবা-মায়ের নামের বানান ঠিক করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। যা অবাক করার মতো।
ভিনদেশ বা ভিনরাজ্য থেকে ফোন আসছে কখনও রাজ্যেরে সিইও দপ্তরে কখনও বা বসতবাড়ি এলাকার কাউন্সিলরের কাছে। ফোনকল বেড়েছে নিউটাউন বা চেতলার বৃদ্ধাশ্রমেও। বিজয়ার শুভেচ্ছা বা প্রতীকী প্রণাম জানাতে বছরে এক-দু’বার ফোন করে যেসব সন্তানরা শুধুই কর্তব্য পালন করতেন। আজকাল তারাই ঘনঘন ফোন করে বাবা-মায়ের খোঁজ নিচ্ছেন। ২৩ বছর পূর্বে মা-বাবা ভোট দিয়েছিলেন কি-না? সে বিষয়ে খুঁটিনাটি জানতে চাইছেন। বলাই বাহুল্য, বাবা-মায়ের পরিচয় আচমকাই দামি হয়ে গেল স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআরে -এর নোটিফিকেশন জারি হওয়ার পর থেকেই।সৌজন্যে নির্বাচন কমিশন।
তথ্য বলছে সিইও দপ্তরের হেল্প ডেস্কে গত এক সপ্তাহে ভিনরাজ্য থেকে বেশ কিছু ফোন এসেছে যারা অনলাইনে এনুমারেশন ফর্ম পূরণের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছেন। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় মা-বাবার নাম খুঁজে পেতে কি করণীয় তা জানতে চেয়েছেন। বসতবাড়ি বিক্রি করে দেওয়া ছেলেবেলার পাড়ায় বিএলও ফর্ম দেবেন নাকি বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে মা-বাবাকে ফর্ম দেবেন এধরনের নানা তথ্য-তালাশ করছেন।
সিইও দপ্তর জানিয়েছে, ২০০২ সালের তালিকায় বাবা-মায়ের নামের সঙ্গে যে ঠিকানা উল্লেখ করা রয়েছে সেই ঠিকানাতেই এনুমারেশন ফর্ম নিয়ে যাবেন বিএলও-রা। সেখানে বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা দেওয়া থাকলে তাদের বাবা-মায়েরা সেখানেই এনুমারেশন ফর্ম পাবেন। এছাড়া বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ যদি কোনও ব্যবস্থা নেন তাহলে তাঁরা ফর্ম পেতে পারেন। তবে এসআইআর পর্বে ভোটার তালিকার তথ্যে কোনও সংশোধন করা যাবে না। ২৩ বছর আগে ভোটার তালিকায় যা নামের বানান ছিল ৯ ডিসেম্বরের খসড়া ভোটার তালিকায় সেই বানানেই বাবা-মা, ঠাকুরদা- ঠাকুমার নাম উল্লেখ থাকবে। খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর একমাস ধরে সংযোজন-বিয়োজনের জন্য আবেদন করা যেতে পারে। তবে শুধুমাত্র খসড়া ভোটার তালিকায় যাদের নাম থাকবে তাদের ক্ষেত্রেই এই আবেদন গ্রাহ্য হবে। ফর্ম ৬ পুরণ করে নতুনভাবে ভোটার তালিকায় নাম তোলার সুযোগও থাকবে।
শহরের একাধিক বৃদ্ধাশ্রমে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে আবাসিকদের মধ্যে কিছুটা হলেও তৎপরতা বেড়েছে। কারণ অনেকের পরিবার থেকেই ফোন এসেছে একাধিকবার। আদরের দাদুভাই-দিদিভাইদের সঙ্গে জমিয়ে গপ্প হয়েছে। কারও ছেলে আবার বাবার ও ঠাকুরদার নামের বানানটাও ভালো করে জেনে নিয়েছে। নাড়ির টান বা রক্তের সম্পর্ক যখন বিচলিত হয় তখন কি আর ‘পুরানো কাসুন্দি’র ঝাঁঝ থাকে? তাই তো দুচোখ বেয়ে ঝরেছে ওই বৃদ্ধ আবাসিকদের আনন্দাশ্রু।
বুড়ো বয়সের ঠিকানা থেকে আধবোজা গলায় বৃদ্ধ দম্পতি বলেন(নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক), “আমরা তো জীবন থেকে অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছি।আমাদের ভোটের কি আর মুল্য আছে? কিন্তু ওদের ভোটটা যেন ওরা দিতে পারে সেটাই চাই। ছেলে-বৌমারা বাইরে থাকে, ওদের অনেক কাজের চাপ। তাও ওরা চেষ্টা করছে। হয়তো দাদুভাই-দিদিভাইকে নিয়ে ভোটের সময় আসতে পারে। অনেকদিন ওদের দেখিনি”।
সত্যিই কি এসআইআরের সৌজন্যে এই প্রতীক্ষার অবসান হবে? এ বিষয়ে কমিশনের এক পদস্থ কর্তা বলেন, “বলা মুশকিল। ভোট ব্যবস্থা যেভাবে উন্নত প্রযুক্তিরে উপর নির্ভর হয়েছে। তাতে প্রচুর অর্থব্যয়ে সশরীরে এসে ফর্মপুরণ বা ভোটদানে পরবাসীরা কতটা আগ্রহী হবেন তা নিয়ে ধন্দ থেকেই যায়।”
বৃদ্ধাবাসের কেয়ারটেকার কথায় ” ওঁদের এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।”
