Pakistan Lyari crime history
Bengal liberty Desk, ৩১ ডিসেম্বর, কলকাতা: করাচির ক্রাইম-থ্রিলার: লিয়ারির রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, রেহমান বালোচ এবং চৌধুরী আসলামের লড়াই
পাকিস্তানের করাচি শহরকে বলা হয় দেশটির অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড (Pakistan Lyari crime history)। কিন্তু এই শহরেরই এক কোণে অবস্থিত ‘লিয়ারি’ (Lyari) নামক এলাকাটি দশকের পর দশক ধরে পরিচিত ছিল অপরাধ, মাদক এবং গ্যাংস্টারের চারণভূমি হিসেবে। লিয়ারির ইতিহাস কেবল অপরাধের নয়, এটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ISI-এর কৌশলগত খেলা এবং সাহসী পুলিশ কর্মকর্তাদের লড়াইয়ের এক জটিল দলিলে পরিণত হয়েছে (Pakistan Lyari crime history)।
১. লিয়ারি: ফুটবল ও বক্সিংয়ের শহর থেকে অপরাধের স্বর্গরাজ্য (Pakistan Lyari crime history)

লিয়ারি করাচির অন্যতম প্রাচীন বসতি। এখানকার বাসিন্দারা মূলত বালোচ জাতিগোষ্ঠীর। ঐতিহাসিকভাবে লিয়ারি দুটি জিনিসের জন্য বিখ্যাত ছিল: ফুটবল এবং বক্সিং। একসময় এখান থেকে পাকিস্তানের জাতীয় দলের সেরা অ্যাথলিটরা উঠে আসত। কিন্তু আশির দশকে যখন আফগান যুদ্ধের ফলে পাকিস্তান হয়ে মাদক ও অস্ত্রের চোরাচালান বাড়তে শুরু করে, তখন লিয়ারির দারিদ্র্যপীড়িত তরুণদের হাতে ফুটবলের বদলে তুলে দেওয়া হয় একে-৪৭।
লিয়ারি ছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টির (PPP) রাজনৈতিক দুর্গ। ফলে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এখানে গড়ে ওঠে বিশাল এক আন্ডারওয়ার্ল্ড। সত্তরের দশকের শেষে মাদক সম্রাট দাদ মুহাম্মদ এবং পরবর্তীতে তার অনুসারীরা লিয়ারিতে ড্রাগ কার্টেল গড়ে তোলে, যা পুরো করাচি শহরকে অস্থির করে তোলে।
২. রেহমান বালোচ: ‘লিয়ারি ডন’ থেকে ‘রবিন হুড’ (Pakistan Lyari crime history)

লিয়ারির ইতিহাসে সবচেয়ে রহস্যময় এবং ক্ষমতাধর চরিত্রের নাম রেহমান বালোচ, যাকে সবাই ‘রেহমান ডাকাত’ বলে চিনত। রেহমানের উত্থান ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। একজন সাধারণ গ্যাং মেম্বার থেকে তিনি হয়ে ওঠেন লিয়ারির একচ্ছত্র অধিপতি।
• জনপ্রিয়তা ও অপরাধের মিশ্রণ: রেহমান বালোচ কেবল একজন খুনি বা অপরাধী ছিলেন না। তিনি লিয়ারির বালোচদের কাছে ছিলেন ‘রবিন হুড’। তিনি নিজের অর্জিত কালো টাকা দিয়ে লিয়ারিতে স্কুল বানাতেন, গরিব মেয়েদের বিয়ে দিতেন এবং স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা (সালিশি) পরিচালনা করতেন। তার জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, লিয়ারির মানুষ তাকে পুলিশ বা রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করত।
• পিপলস আমান কমিটি: রেহমান ‘পিপলস আমান কমিটি’ (PAC) নামক একটি সংগঠন তৈরি করেন। এটি নামমাত্র একটি সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হলেও আসলে এটি ছিল তার নিজস্ব গ্যাংস্টার বাহিনী, যা পুরো করাচির চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত।
৩. ISI এবং রেহমান বালোচ: এক বিপজ্জনক সমীকরণ
পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ISI-এর সঙ্গে রেহমান বালোচের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত এবং রহস্যময়। কেন রাষ্ট্র একজন দাগী অপরাধীকে ব্যবহার করত? এর পেছনে ছিল করাচির রাজনৈতিক সমীকরণ।
• MQM বনাম লিয়ারি: করাচির রাজনীতিতে ‘মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট’ (MQM)-এর আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত। রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী অনেক সময় MQM-এর ক্ষমতাকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে লিয়ারির গ্যাংস্টারদের ব্যবহার করত। রেহমান বালোচের বাহিনীকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অনেক সময় ‘প্রক্সি’ হিসেবে ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে।
• কৌশলগত ব্যবহার: অভিযোগ রয়েছে যে, বালোচিস্তান সংকটের সময় যখন বালোচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সক্রিয় ছিল, তখন রেহমান বালোচকে দিয়ে তাদের ওপর নজরদারি বা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ করাত রাষ্ট্র। এই সম্পর্কের কারণেই রেহমান বালোচ বছরের পর বছর পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পেরেছিলেন।
৪. কেন পাকিস্তান জঙ্গিদের ঘাঁটি?
পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে জঙ্গি গোষ্ঠীকে কেন প্রশ্রয় দেয়, তা বুঝতে হলে তাদের ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ বা কৌশলগত গভীরতা নীতি বুঝতে হবে।
1. প্রতিবেশী নিয়ন্ত্রণ: আফগানিস্তানে ভারতীয় প্রভাব রুখতে এবং কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতকে চাপে রাখতে পাকিস্তান লস্কর-ই-তৈয়বা বা জইশ-ই-মুহাম্মদের মতো গোষ্ঠীকে ‘অ্যাসেট’ হিসেবে ব্যবহার করে।
2. মাদ্রাসা ও কট্টরপন্থা: আশির দশকে সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধের সময় থেকে গড়ে ওঠা হাজার হাজার অনিয়ন্ত্রিত মাদ্রাসা উগ্রবাদী আদর্শ ছড়িয়েছে।
3. আর্থিক ফায়দা: অনেক সময় আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব পেতে পাকিস্তান এই উগ্রবাদকে একটি ব্যবসা হিসেবেও ব্যবহার করে।
৫. এসপি চৌধুরী আসলাম খান: লিয়ারির যমরাজ
করাচির অপরাধ জগত যখন তুঙ্গে, তখন ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন সিন্ধু পুলিশের দুঃসাহসী অফিসার চৌধুরী আসলাম খান। তিনি ছিলেন লিয়ারি গ্যাংস্টার এবং তালেবান জঙ্গিদের যম।
• শৈলী: চৌধুরী আসলাম প্রচলিত আইনি ব্যবস্থার চেয়ে ‘এনকাউন্টার’ বা বন্দুকযুদ্ধে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি সাদা শার্ট-প্যান্ট পরে, সিগারেট টান দিতে দিতে বুলেটপ্রুফ গাড়ি নিয়ে লিয়ারির অলিগলি কাঁপিয়ে বেড়াতেন।
• রেহমান বালোচের সাথে সংঘাত: চৌধুরী আসলামই ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি রেহমান বালোচকে ধরতে বা দমনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন। ২০০৯ সালের ৯ আগস্ট, করাচির মৌরিপুর এলাকায় একটি রোমাঞ্চকর বন্দুকযুদ্ধে চৌধুরী আসলামের নেতৃত্বাধীন টিম রেহমান বালোচকে খতম করে।
• জঙ্গিদের টার্গেট: কেবল লিয়ারির গ্যাংস্টার নয়, আসলাম খান তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP)-এর বহু উচ্চপদস্থ জঙ্গিকে খতম করেছিলেন। তার ওপর বহুবার আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়েছে। ২০১১ সালে তার বাড়িতে বিশাল এক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, কিন্তু তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান এবং ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, “আমি জঙ্গিদের কবর খুঁড়ব।”
• মহাপ্রয়াণ: ২০১৪ সালের ৯ জানুয়ারি, করাচির লিয়ারি এক্সপ্রেসওয়ের ওপর এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় এই নির্ভীক অফিসার নিহত হন। তার মৃত্যু ছিল করাচি পুলিশের জন্য অপূরণীয় এক ক্ষতি।
৬. বর্তমান লিয়ারি ও লব্ধ শিক্ষা
রেহমান বালোচের মৃত্যু এবং চৌধুরী আসলামের আত্মত্যাগের পর লিয়ারিতে বড় ধরনের সামরিক অপারেশন চালানো হয়। বর্তমানে লিয়ারি আগের মতো ভয়ঙ্কর না হলেও অপরাধের রেশ এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি।
লিয়ারির ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যখন রাষ্ট্র নিজের স্বার্থে অপরাধীদের ব্যবহার করে (যেমন ISI রেহমান বালোচকে করেছিল), তখন সেই অপরাধীরাই একসময় রাষ্ট্রের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। আবার চৌধুরী আসলামের মতো অফিসাররা প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়াই করলে অপরাধ সাম্রাজ্যের পতন সম্ভব। পাকিস্তান যদি সত্যিকার অর্থে জঙ্গিবাদ ও গ্যাং কালচার থেকে মুক্ত হতে চায়, তবে তাকে ‘ভাল জঙ্গি’ ও ‘মন্দ জঙ্গি’—এই দ্বিচারিতা ত্যাগ করতে হবে।
