Harish Rana death
Bengal Liberty, ২৪ মার্চ ২০২৬ :
মৃত্যু কি শুধুই একটি মুহূর্তের ঘটনা, নাকি দীর্ঘ এক যন্ত্রণার মুক্তি? উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের যুবক হরিশ রানার প্রয়াণ আজ এই প্রশ্নটিই তুলে দিয়ে গেল (Harish Rana death)। দীর্ঘ ১৩ বছর নিস্পন্দ দেহে, চেতনার অতল গহ্বরে বন্দি থেকে আজ না-ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। ১৩ বছর আগে যে তরুণের জীবন থমকে গিয়েছিল, আজ তাঁর সেই দীর্ঘ অপেক্ষার যন্ত্রণাময় অবসান ঘটল।
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের পর ভারতে প্যাসিভ ইউথানেশিয়ার ক্ষেত্রে প্রথম নজির হিসেবে পরিচিত হরিশ রানা । দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ভেজিটেটিভ অবস্থায় থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে। দিল্লির এইমস হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

কেন স্বেচ্ছামৃত্যু?
জানা গিয়েছে, গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ ১৩ বছর ধরেই তিনি অচেতন অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় আদালতের নির্দেশ মেনে তাঁর ক্ষেত্রে প্যাসিভ ইউথানেশিয়া প্রক্রিয়া কার্যকর করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর শেষ পর্যন্ত হরিশ রানার পক্ষেই রায় দিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালত।
স্বেচ্ছামৃত্যু বা ইউথানেশিয়া হলো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর জন্য চিকিৎসকের সহায়তা বা চিকিৎসা বন্ধ করে জীবনাবসানের প্রক্রিয়া, যা যুগ যুগ ধরে বিতর্কিত। গ্রিক ও রোমান যুগে এর প্রচলন থাকলেও, আধুনিক যুগে এটি সক্রিয় (ওষুধ প্রয়োগ) ও নিষ্ক্রিয় (চিকিৎসা বন্ধ) রূপে পরিচিত। নেদারল্যান্ডস ২০০২ সালে প্রথম এটি আইনত বৈধ করে।
ভারতে কীভাবে প্রবেশ :
বিশ্বের অনেক জায়গায় স্বেচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করা হলেও ভারতে এর আগমন অনেক দেরিতে ঘটে। তবে সিনেমার পর্দায় প্রথম এই বিষয়টি তুলে ধরেন বর্ষীয়ান পরিচালক সঞ্জয় লীলা ভনশালী তাঁর ছবি গুজারিশ-এ। এই ছবিতে হৃতিক রোশন ‘ইথান মাসকারেনাস’ চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবির মূল প্রেক্ষাপট ছিল এক ম্যাজিশিয়ান, যিনি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানান।
যে দুর্ঘটনা থমকে দিয়েছিল সময়কে
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৩ সালে। উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের এক প্রাণচঞ্চল যুবক ছিলেন হরিশ রানা। কিন্তু ভাগ্যের এক নিষ্ঠুর পরিহাসে একটি বহুতল ভবন থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন তিনি। সেই পতন কেবল তাঁর হাড়গোড় ভাঙেনি, ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল তাঁর স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে। মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় সেই যে তিনি জ্ঞান হারালেন, তারপর আর নিজের চোখে পৃথিবী দেখা হয়নি তাঁর।

১৩ বছরের নিথর সংগ্রাম
২০১৩ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ ১৩টি বছর হরিশ ছিলেন ‘কোমা’র অন্ধকারে। চিকিৎসা পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘পারসিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’। অর্থাৎ শরীর ছিল, কিন্তু ছিল না কোনো চেতনা। নিজের থেকে হাত নাড়ানো, কথা বলা বা এমনকি যন্ত্রণার অনুভূতি প্রকাশ করার ক্ষমতাও হারিয়েছিলেন তিনি। কৃত্রিম উপায়ে নল দিয়ে তাঁকে খাবার দেওয়া হতো। ১৩ বছর ধরে তিনি ছিলেন একটি নিথর শরীরের খাঁচায় বন্দি একজন জীবন্ত মানুষ।
পরিবারের নীরব কান্না ও মানবিক ধৈর্য
হরিশের এই প্রয়াণ কেবল একজন যুবকের মৃত্যু নয়, এটি তাঁর পরিবারের দীর্ঘ ১৩ বছরের নিঃশব্দ ত্যাগেরও সমাপ্তি। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হরিশের পরিবার এই আশায় দিন গুনেছে—হয়তো কোনো অলৌকিক ঘটনায় তাদের সন্তান আবার চোখ মেলবে। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদী এই চিকিৎসা কেবল অর্থনৈতিক নয়, মানসিকভাবেও ছিল চরম যন্ত্রণাদায়ক। হরিশের নিথর দেহের পাশে বসে তাঁর বাবা-মায়ের দিন কাটানোর গল্পটি ছিল আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অসহায়তা আর মানুষের অসীম ধৈর্যের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
২০১৮ সালে সর্বোচ্চ আদালত প্রথমবারের মতো প্যাসিভ ইউথানেশিয়া বৈধতা দেয়। হরিশ রানা ভারতের ইতিহাসে এই অনুমতি পাওয়া প্রথম ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম।
হরিশের মৃত্যু এক গভীর জীবনবোধ ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে দেয়। ১৩ বছর ধরে একজন মানুষকে কেবল শরীরে বাঁচিয়ে রাখা কি সার্থকতা, নাকি এটি প্রকৃতির এক অদ্ভুত পরীক্ষা? আজ হরিশের মৃত্যু সংবাদে গাজিয়াবাদে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কিন্তু ১৩ বছরের এই নিস্তব্ধ লড়াই মানুষের সহনশীলতার এক অনন্য ইতিহাস হয়ে থেকে যাবে।
