Phase 1 Voting Violence
Bengal Liberty, ২৩ এপ্রিল :
উৎসবের বদলে রক্তস্নান, গণতন্ত্র কি আজ প্রহসন?অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের হাজারো প্রতিশ্রুতি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া পাহারা, আর সিসিটিভির নজরদারি, সবই যেন খাতায়-কলমে বন্দি থেকে গেল (Phase 1 Voting Violence)! পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শুরু হতেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে এল বিচ্ছিন্ন অশান্তি, রক্তপাত আর আর্তনাদের খবর। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ যখন নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের অপেক্ষায়, তখন বুথের বাইরে চলল আগ্নেয়াস্ত্রের আস্ফালন, বোমাবাজি এবং ছাপ্পা ভোটের চেষ্টা। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই গোটা তাণ্ডবলীলায় পরিকল্পিতভাবে নিশানায় পরিণত হয়েছেন ৯০ শতাংশ বিরোধী দলের প্রার্থীরা, এজেন্ট ও কর্মীরা। শাসকদলের পেশিশক্তির সামনে নির্বাচন কমিশনের কড়াকড়ি যে কতটা অসহায়, প্রথম দফার এই চিত্র যেন তারই এক নগ্ন রূপ তুলে ধরল (Phase 1 Voting Violence)।

বীরভূমে বেলাগাম সন্ত্রাস (Phase 1 Voting Violence)
প্রথম দফার ভোটে রীতিমতো রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে লাল মাটির জেলা বীরভূম। নানুরে সকাল থেকেই বিজেপি কর্মীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল নেতা কল্যাণ সিং-এর বিরুদ্ধে। সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছে লাভপুরে। সেখানে বুথ দখলের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পথে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীদের ছোঁড়া ইটের ঘায়ে মাথা ফেটেছে বিজেপি প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট বিশ্বজিৎ মণ্ডলের। বর্তমানে তিনি সিউড়ি সুপার স্পেশালিটিতে চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে, মুরারইয়ের গোরসা পঞ্চায়েতের ৩১ নম্বর বুথেও বাদ যায়নি কংগ্রেস। তৃণমূল ও কংগ্রেসের ব্যাপক সংঘর্ষে মাথা ফেটেছে দুই কংগ্রেস কর্মীর। কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে কীভাবে এই হামলা ঘটল, তা নিয়ে উঠছে বড়সড় প্রশ্ন।

বারুদের স্তূপে মুর্শিদাবাদ (Phase 1 Voting Violence)
মুর্শিদাবাদের চিত্রটা আরও ভয়াবহ। ‘বোমকল’ খ্যাত ডোমকলের ২১৭ নম্বর বুথে তৃণমূল আশ্রিত সশস্ত্র দুষ্কৃতীদের দাপাদাপিতে ভোট প্রক্রিয়াই বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগ, প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে ভোটারদের ভয় দেখানো হয়েছে, অথচ দীর্ঘক্ষণ দেখা মেলেনি কেন্দ্রীয় বাহিনীর। মোথাবাড়িতেও সেক্টর অফিসারের দেরিতে পৌঁছানো নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন জনতা। এর পাশাপাশি নওদার ১৭৩ নম্বর বুথ ঘিরে তৃণমূল ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীরের সমর্থকদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ বেধে যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের সাথেও ধস্তাধস্তি শুরু হয়।

প্রার্থী ও এজেন্টদের উপর পরিকল্পিত হামলা(Phase 1 Voting Violence)
বিরোধী দলের মনোবল ভাঙতে খোদ প্রার্থীদের গায়ে হাত তুলতেও পিছপা হয়নি শাসকদলের দুষ্কৃতীরা। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকারকে পুলিশের সামনেই রাস্তায় ফেলে কিল, চড় ও লাথি মারার মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। গুরুতর জখম অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মালদহের চাঁচল বিধানসভার ধুমসাডাঙি বুথেও একই চিত্র। সেখানে ভোটারদের বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ করায় বিজেপি প্রার্থীর এজেন্ট লক্ষ্মণ পাণ্ডেকে বেধড়ক মারধর ও তাঁর গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

পটাশপুরে মৃত্যু মিছিল, তুফানগঞ্জে বুথ জ্যামিংয়ের অভিযোগ (Phase 1 Voting Violence)
গণতন্ত্রের এই উৎসবে মিশেছে মৃত্যুর শোকও। পটাশপুরে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাকালীন হঠাৎ মৃত্যু হয়েছে এক বিজেপি কর্মীর, যা নিয়ে এলাকায় নেমেছে শোকের ছায়া। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের কোচবিহারের তুফানগঞ্জ বিধানসভাতেও শাসকদলের বিরুদ্ধে উঠেছে বুথ জ্যামিংয়ের মারাত্মক অভিযোগ। মহিষকুচি ২ গ্রাম পঞ্চায়েত বাকলা এলাকার ৪০ ও ৪১ নম্বর বুথে তৃণমূল কর্মীদের ব্যাপক জমায়েত সাধারণ ভোটারদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

শেষবেলায় ৩ জেলায় জারি চরম সতর্কতা (Phase 1 Voting Violence)
সারাদিন ধরে বিরোধীদের উপর চলা এই একতরফা হামলার পর, শেষবেলায় ঘুম ভাঙে নির্বাচন কমিশনের। বিকেল চারটের পর বুথ জ্যামিং ও এলাকা দখলের আশঙ্কা করে মুর্শিদাবাদ, কোচবিহার এবং বীরভূম—এই তিন জেলায় বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়। কিন্তু সকাল থেকে শাসকদলের যে তাণ্ডব বাংলার মানুষ দেখল, তাতে এই ‘সতর্কতা’ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দিহান রাজনৈতিক মহল।

ব্যালট বনাম বুলেট, কোন পথে বাংলার ভবিষ্যৎ? (Phase 1 Voting Violence)
প্রথম দফার ভোটগ্রহণ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, বাংলার রাজনীতিতে ‘ভয়’ নামক অস্ত্রটি আজও কতটা প্রাসঙ্গিক। পরিকল্পিতভাবে শুধুমাত্র বিরোধী শিবিরের কর্মী, এজেন্ট ও প্রার্থীদের বেছে বেছে আক্রমণ করা প্রমাণ করে যে, শাসকদল কোনওভাবেই রাজনৈতিক জমি ছাড়তে নারাজ। নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতেও যদি বিরোধীদের রক্ত ঝরে, প্রার্থীকে মার খেতে হয়, আর সাধারণ ভোটারকে আগ্নেয়াস্ত্র দেখে বাড়ি ফিরে যেতে হয়—তবে এই নির্বাচন কার স্বার্থে? দিনের শেষে বাংলার এই রক্তাক্ত প্রান্তর গণতন্ত্রের রক্ষকদের কাছে একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন রেখে গেল—এ রাজ্যে শেষ কথা কে বলবে, ব্যালট নাকি বুলেট?
