Budget in Bangladesh
Bengal Liberty, নয়ন বিশ্বাস রকি, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সমাজসেবক ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কর্মী:
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট (Budget in Bangladesh) ঘোষণা করা হয়েছে। কাগজে ১২ লাখ কোটি টাকার বড় অঙ্ক দেখা গেলেও দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এই বাজেটের কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। কারণ এই বাজেটে গরিবের জন্য কোনো স্বস্তি নেই, বরং আছে কেবল মূল্যবৃদ্ধির নতুন ফাঁদ।

বাজেট ঘোষণার পরপরই দাম বৃদ্ধি (Budget in Bangladesh)
বাজেট পেশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৬৮% বাড়ানো হয়েছে এবং কোনো কোনো স্ল্যাবে এই বৃদ্ধির হার ১৯.৯৪% পর্যন্ত ঠেকেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে একবার ৮.৫% বা ৭০ পয়সা বাড়ানোর পর আবার এই নতুন বৃদ্ধি চাপানো হলো, যার ফলে বর্তমানে গড় দাম ইউনিটপ্রতি দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ৯৫ পয়সায়। একই সাথে জ্বালানি তেলের দামও দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে। গত ১ জুন থেকে কেরোসিন ১৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকা থেকে ১৪০ টাকা লিটার করা হয়েছে।

যদিও ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, কিন্তু গত ১৯ এপ্রিলেই তা ১০-১৫% বাড়ানো হয়েছিল এবং তখন পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে একলাফে ১৩৫ টাকা করা হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি হলো অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি, তাই এর দাম বাড়ার সরাসরি অর্থ হলো পরিবহন, কৃষি ও শিল্পসহ সব খাতে খরচ বেড়ে যাওয়া। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এই বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেবে।
কৃষি উৎপাদন ও শিল্প খাতে নতুন সংকট (Budget in Bangladesh)
জ্বালানি ও বিদ্যুতের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি দেশের উৎপাদনশীল খাতগুলোকে গভীর সংকটে ফেলছে। সেচে বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৮২ পয়সা থেকে বেড়ে ৫ টাকা ২৫ পয়সা হওয়ায় এবং ডিজেলের চড়া দামের কারণে ধান ও সবজি উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ঘাড়েই পড়বে। শিল্প ও কর্মসংস্থানের চিত্রও সমান উদ্বেগজনক। উচ্চ চাপ শিল্পে বিদ্যুতের দাম ৯ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১০ টাকা ৭৫ পয়সা করায় উৎপাদন খরচ প্রায় ১০% বাড়বে বলে জানিয়েছে বিটিএমএ।

উচ্চ সুদ আর গ্যাস সংকটের মধ্যে এই বাড়তি বোঝা আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের রপ্তানির প্রতিযোগিতা নষ্ট করবে এবং কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিকরা বেকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করবে। সাধারণ ভোক্তাদের রান্নার খরচও আকাশচুম্বী, যেখানে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার ছিল ১,৩৫৬ টাকা, তা জুনে এসে দাঁড়িয়েছে ১,৮৮৫ টাকায়। চার মাসে ৫২৯ টাকা বাড়ার পাশাপাশি গ্রামে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টাই লোডশেডিং থাকছে, অথচ বিল আসছে তিনগুণ।
ভর্তুকির অজুহাতে জনগণের পকেট কাটা (Budget in Bangladesh)
সরকার ইরান যুদ্ধের কারণে ভর্তুকি বৃদ্ধির অজুহাত দিচ্ছে এবং দাবি করছে যে মার্চ থেকে জুন মাসের মধ্যে শুধু জ্বালানি ও এলএনজিতেই ৩১,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি লাগবে। এমনকি পাওয়ার ডিভিশন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ৫৯,১৪৫ কোটি টাকা চেয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির সিপি কমে যাওয়ার কারণে জুনে দাম ৫৫ টাকা কমেছে। প্রশ্ন হলো, বিশ্ববাজারের এই দাম কমার সুফল জনগণ কেন পাচ্ছে না? উল্টো সরকারের ক্যাপাসিটি চার্জ, সিস্টেম লস আর দুর্নীতির দায় চাপানো হচ্ছে সাধারণ ও ছোট ভোক্তাদের ঘাড়ে।

বিগত সরকারের স্থিতিশীলতার সাথে বর্তমানের তুলনা (Budget in Bangladesh)
বিগত শেখ হাসিনা সরকারের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সাথে বর্তমান বিএনপি সরকারের জুন ২০২৬ এর অর্থনৈতিক চিত্র তুলনা করলে দেখা যায় সাধারণ মানুষ কতটা বিপদে আছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ডিজেল ১০০ টাকায় স্থির রাখা হয়েছিল, যার ফলে কৃষি ও পরিবহন খাত স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু বর্তমান বাজেটে দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে সেই স্থিতিশীলতা সম্পূর্ণ নষ্ট করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ১১৬ টাকার পেট্রোল এখন ১৪০ টাকা হওয়ায় পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। বিদ্যুতের গড় দাম ৮.২৫ টাকা থেকে বেড়ে নতুন ১৬.৬৮% বৃদ্ধিসহ শিল্প ও বাসাবাড়ির খরচ ২৫%-এর বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। একইভাবে ১,৩০৬ টাকার ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার এখন ১,৮৮৫ টাকা হওয়ায় সাধারণ মানুষের রান্নার খরচ ৪৪% বৃদ্ধি পেয়েছে।
উন্নয়নের দর্শন এবং সাধারণ মানুষের হাহাকার (Budget in Bangladesh)
এই বাজেটে মেগা প্রকল্পের জন্য বিশাল বরাদ্দ রাখা হলেও টিসিবির পণ্যের দাম কমানোর কোনো নির্দেশনা নেই। গরিব মানুষের জন্য ১০০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্প কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি বাড়ানোর কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা এখানে রাখা হয়নি। অর্থনীতির মূল কথা হলো, প্রবৃদ্ধির সুফল যখন তৃণমূলের মানুষ পায় না, তখন সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হয় না। আজ দেশের কৃষক, শ্রমিক আর মধ্যবিত্ত সমাজ পুরোপুরি দিশেহারা। বাজারে গেলে আয়ের সাথে ব্যয়ের কোনো হিসাব মিলছে না, কারণ মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয় হয়ে উঠেছে লাগামহীন।

জনগণের প্রত্যাশা ও দুঃখী মানুষের মুখের হাসি (Budget in Bangladesh)
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “এই স্বাধীনতা তখনই সার্থক হবে যেদিন দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটবে।” কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট সেই সাধারণ মানুষের মুখের হাসি কেড়ে নেওয়ার বাজেট। এখানে গরিবের কোনো লাভ নেই এবং জিনিসপত্রের দাম কমার কোনো সম্ভাবনা তো নেই-ই, বরং তা আরও বাড়বে—এটাই অর্থনীতির সরল হিসাব। দেশের মানুষ তাই এই বাজেটে কোনো বিশ্বাস রাখতে পারছে না, কারণ পেটে ক্ষুধা রেখে কখনো উন্নয়নের গল্প শোনানো যায় না।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ নেতৃত্ব হুমকির সম্মুখীন


