France Morocco Riot
Bengal Liberty
ফিফা বিশ্বকাপের হাই-ভোল্টেজ সেমিফাইনালের(France Morocco Riot) মেগা ম্যাচে মরক্কোকে ২-০ গোলে পরাজিত করে জয় তুলে নিয়েছে ফ্রান্স। এই ঐতিহাসিক জয়ের সঙ্গে সঙ্গেই টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রবেশ করল কিলিয়ান এমবাপের দল।
ম্যাচটিকে কেন্দ্র করে প্রথম থেকেই এক ধরনের উত্তেজনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।


তবে মাঠের খেলায় তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও, ম্যাচ শেষ হতেই ইউরোপের বিখ্যাত দুই শহর—লন্ডন ও প্যারিসের রাস্তায় দাঙ্গাবাজদের তাণ্ডব চরমে ওঠে। লন্ডনের রাস্তায় দাঙ্গাবাজরা নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে উসকানিমূলক স্লোগান দিতে শুরু করে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং উত্তেজিত জনতা মারমুখী হয়ে ওঠে। একে অপরকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়া হয়; ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় বহু গাড়ি, দোকানপাট এবং বাড়িঘরে।
দাঙ্গার ভয়ঙ্কর প্রতিচ্ছবি(France Morocco Riot)
পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ বেশ দক্ষতার সাথে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে উগ্র সমর্থকদের ক্ষোভ থেকে রেহাই পায়নি পুলিশের গাড়িও; বেশ কিছু জায়গায় পুলিশের ওপর হামলা চালানো হয়। একই রকম ভয়াবহ দৃশ্য দেখা গেছে প্যারিসের রাস্তাতেও। পরবর্তীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে পুলিশ বেশ কয়েকজন দুষ্কৃতকারীকে গ্রেপ্তার করে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে, ফ্রান্সের বড় কোনো ম্যাচের পরেই কেন বারবার এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে? এর আগেও ইউরোপীয় ফুটবলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচকে কেন্দ্র করে প্যারিসের রাস্তায় তুমুল বিশৃঙ্খলার ছবি সামনে এসেছিল। এবার মরক্কোকে হারানোর পরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল।
কিন্তু ঠিক কী কারণে জনসাধারণের একাংশের মধ্যে এমন উগ্র আচরণ দেখা যাচ্ছে? কেন বারবার এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে? এর পেছনে কাজ করছেকিছু গভীর সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণ।

ইউরোপে মুসলিম অভিবাসনের ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট(France Morocco Riot)
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট(France Morocco Riot)
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর বহু মানুষ জীবন বাঁচাতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠী বসবাস করছেন।
আইবেরীয় উপদ্বীপ বিজয়

উমাইয়া খিলাফতের আমলে তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে স্পেন ও পর্তুগাল বিজয়ের মাধ্যমে আন্দালুসিয়ায় (Al-Andalus) প্রায় ৭০০ বছরের মুসলিম শাসনের সূচনা হয়েছিল, যার অবসান ঘটে ১৪৯২ সালে।মধ্য ইউরোপ ও বলকান অঞ্চল ১৪শ থেকে ১৭শ শতকের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্য বলকান অঞ্চলে প্রবেশ করে সার্বিয়া, বসনিয়া ও গ্রিস জয় করে। এমনকি ১৬৮৩ সাল পর্যন্ত ভিয়েনাও অবরুদ্ধ ছিল।
আধুনিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট(France Morocco Riot)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলো বিপুল সংখ্যক মুসলিম শ্রমিক গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে স্থায়ী অভিবাসনে রূপ নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া ও আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে আসা লাখ লাখ শরণার্থী এই সংখ্যা আরও বাড়িয়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারে(France Morocco Riot)
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইউরোপের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৯% ছিল মুসলিম। ইউরোপীয় দেশগুলোর নিম্ন জন্মহার এবং মুসলিম অভিবাসীদের তুলনামূলক কম গড় বয়সের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে এই হার ৭.৫%-এরও বেশি হতে পারে।
এই জনমিতিক পরিবর্তন ইউরোপীয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। ফলে স্থানীয় সমাজ ও অভিবাসীদের মধ্যকার সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে বিতর্ক এখন বেশ তুঙ্গে।
ফুটবলে দাঙ্গার ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি(France Morocco Riot)
ফুটবলকে কেন্দ্র করে এমন সহিংসতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। অতীতেও এমন কিছু কালো অধ্যায় তৈরি হয়েছে
ফুটবল যুদ্ধ (১৯৬৯)(France Morocco Riot)
হন্ডুরাস এবং এল সালভাদোরের মধ্যে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সামরিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল।
হেসেল স্টেডিয়াম ট্র্যাজেডি (১৯৮৫)(France Morocco Riot)
ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে লিভারপুল ও জুভেন্টাস সমর্থকদের সংঘর্ষে স্টেডিয়ামের দেয়াল ধসে ৩৯ জন নিহত হন। এরপর ব্রিটিশ ক্লাবগুলোকে ৫ বছরের জন্য ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় নিষিদ্ধ করা হয়।
হিলসবারো ট্র্যাজেডি (১৯৮৯)(France Morocco Riot)
লিভারপুল বনাম নটিংহ্যাম ফরেস্টের ম্যাচে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত দর্শক প্রবেশের ফলে সৃষ্ট হুড়োহুড়িতে ৯৭ জন সমর্থক প্রাণ হারান।
লিমা ট্র্যাজেডি, পেরু (১৯৬৪)(France Morocco Riot)
পেরু ও আর্জেন্টিনার অলিম্পিক বাছাইপর্বের ম্যাচে রেফারি একটি গোল বাতিল করলে দর্শক দাঙ্গা শুরু হয়। পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের কারণে পদদলিত হয়ে প্রায় ৩২০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এই ধরনের ভয়াবহ ঘটনার পর থেকে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা (ফিফা) স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং দর্শক নিয়ন্ত্রণ আইন অত্যন্ত কঠোর করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাঠের বাইরের এই উন্মাদনা বারবার ফুটবলের সৌন্দর্যকে কালিমালিপ্ত করছে। ফুটবল সমর্থকরা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের আচরণ সংবরণ করবেন, নাকি এই দাঙ্গাবাজ সংস্কৃতিই বজায় রাখবেন—তা এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।
আরো পড়ুন:-

