modi rally
Bengal Liberty Desk, ১৪ মার্চ, কলকাতা: ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশ হতে আর মাত্র ১-২ দিন বাকি। তার আগেই ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা কলকাতার মাটি থেকেই বাজিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আজ, শনিবার দুপুরে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত বিশাল জনসভা থেকে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে রাজ্যে ‘পরিবর্তন’ এখন অনিবার্য বলে বড় দাবি করলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এই জনসভাকে ঘিরে আজ ব্রিগেড ময়দান একপ্রকার গেরুয়া সমুদ্রে পরিণত হল।
বাংলার ঐতিহ্যে শান (PM Modi Brigade Kolkata 2026)

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতে ‘আমার প্রিয় পশ্চিমবঙ্গবাসী ভাই ও বোনেরা’ বলে বাংলায় সম্ভাষণ জানিয়ে উপস্থিত জনতাকে আপ্লুত করেন। ব্রিগেডের মঞ্চটি তৈরি করা হয়েছিল দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে এবং সেখানে বাংলার টেরাকোটা ও পটের শিল্পকর্ম ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।
প্রদানমন্ত্রী বলেন, “বাংলার ঐতিহাসিক মাটি। এই ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের ঐতিহাসিক ময়দান আর বাংলার মানুষের ঐতিহাসিক জনস্রোত। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের ইতিহাস সাক্ষী আছে, যখন যখন বাংলা দেশকে দিশা দেয় এই ব্রিগেড ময়দান বাংলার আওয়াজ হয়ে ওঠে। এই ময়দানে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে আওয়ার উঠেছিল। সেই আওয়াজ হিন্দুস্তানে স্বাধীনতা এনেছিল। ফলস্বরূপ ইংরেজদের লুট শেষ হয়েছিল। আজ আবার ব্রিগেড গ্রাউন্ড নতুন বাংলার ক্রান্তি শুরু হয়েছে। এবার বাংলা থেকে নির্মম সরকার শেষ হবেই। এবার বাংলা থেকে মহাজঙ্গলরাজের অবসান হবে। তাই – বাংলার সব কোণ থেকে আওয়াজ উঠছে – চাই বিজেপি সরকার।”
তৃণমূলকে তীব্র আক্রমণ মোদির (PM Modi Brigade Kolkata 2026)

ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে ‘নির্মম সরকার’ বলে কটাক্ষ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “কালকে টিএমসি র্যালিতে আসা সব লোকেদের চোর বলে গালি দিয়েছেন। আসল চোরকে তা বাংলার জনতা জানে। নিজেদের ক্ষমতা চলে যাচ্ছে দেখে এখানকার নির্মম সরকার পাগল হয়ে গিয়েছে। আজকেও বিশাল সভা আটকাতে নির্মম সরকার সব রকম চেষ্টা করেছে। আপনাদের আটকাতে ব্রিজ বন্ধ করেছে। গাড়ি আটকেছে। ট্রাফিক জ্যাম করেছে। বিজেপির পতাকা ছিঁড়ে দিয়েছে। পোস্টার ছিঁড়েছে। কিন্তু নির্মম সরকার দেখে রাখো আজ জনস্রোতকে আটকাতে পারেননি। বাংলায় মহাজঙ্গলরাজ শেষ হওয়ার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। সেই দিন দূরে নয়, যখন বাংলায় আবার আইনের শাসন হবে। যে আইন ভাঙবে, অত্যাচার করবে, তৃণমূলের কোনও অত্যাচারীকে ছাড়া হবে না। বেছে বেছে হিসেব নেওয়া হবে।”
মনীষীদের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়বে বিজেপি: মোদি (PM Modi Brigade Kolkata 2026)

প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “এখানকার নির্মম সরকার যতই জোর দিক পরিবর্তনের ঝড়কে আটকাতে পারবে না। বিজেপির সঙ্গে, এনডিএর সঙ্গে মহিষাসুরমর্দিনীর আশীর্বাদ আছে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস, ঋষি বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বাঘাযতীন, ক্ষুদিরাম বসু, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, লোকমাতা রানি রাসমণি – তাঁরা যে বাংলার পরিকল্প না করেছিল বিজেপির সরকার সেই বাংলা গড়বে। বাংলার নবনির্মাণ করবে।”
‘বাংলার হৃত গৌরব ফেরাতে হবে, রাজ্যের মেধা বাইরে চলে যাচ্ছে কেন?’

এদিন প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এখানকার নির্মম সরকার বাংলার যুবদের পলায়নের অভিশাপ দিয়েছে। আপনারা সবাই জানেন বাংলার যুব সমাজ প্রতিভায় সবচেয়ে এগিয়ে। বাংলার যুবসমাজ পরিশ্রমে সব থেকে এগিয়ে। বাংলা একসময়ে পুরো ভারতের বিকাশকে গতি দিয়েছিল। বাংলা বাণিজ্য ব্যবসায় সবার আগে ছিল। আজ কী অবস্থা! এখানকার যুবরা না ডিগ্রি নিতে পারছে না রোজগার করতে পারছে। আপনার ছেলে মেয়েরা কাজের খোঁজ করতে অন্য রাজ্যে চলে যেতে হচ্ছে। আগে কংগ্রেস তারপরে কমিউনিস্ট আর এখন টিএমসি – এরা একের পর এক এসেছে এবং নিজেদের পকেট ভরেছে। বাংলায় বিকাশের কাজ কিছু করেনি। ইনফ্রাস্ট্রাকচারের বিষয়ে আমাদের বাংলা পিছিয়ে গেছে। উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই টিএমসি সরকারের আমলে চাকরি বিক্রি হচ্ছে। ভরতিতে দুর্নীতি হচ্ছে। এবার সময়ে এসেছে, সময় এসেছে পরিস্থিতি বদলানোর। বাংলার যুবদের বাংলায় কাজ পাবে। যুব সমাজ বাংলার বিকাশের নেতৃত্বে দেবে। এই স্বপ্ন আপনার, এই স্বপ্ন পূরণ করা মোদির গ্যারান্টি।”
পিএম আবাস যোজনা থেকে বাংলার বাড়ি প্রকল্প
আবাস যোজনার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনারা সকলে সারা দেশে পিএম আবাস যোজনার সাফল্য শুনেছেন। বাংলার বাইরে যাঁরা থাকেন এমন সব গরিব পরিবার পাকা বাড়ি পাচ্ছে। কিন্তু এখানে কী হল। যোজনার নাম বদলে দিলো। উপভোক্তাদের সূচিতে গরমিল করেছে। তাই গরীব মানুষ যাদের ঘর পাওয়ার কথা তারা আজও অপেক্ষায়।”
আরজিকর থেকে সন্দেশখালি, নারীসুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন মোদির (PM Modi Brigade Kolkata 2026)

বাংলায় নারীসুরক্ষা নিয়ে পএদিন ফের সরব হতে দেখা গেল প্রধানমন্ত্রীকে। তিনি বলেন, “আজ বাংলায় অপরাধীরা খোলা ছাড় পেয়েছে। প্রতিদিনই বোন মেয়েদের উপর অপরাধ হয়। কলেজ পরিসরে দুষ্কর্ম হচ্ছে। নাবালিকদের সঙ্গে দুষ্কর্মের মামলা তৃণমূলের অফিসে ঘটছে। ৭-৮ বছরের বাচ্চাদের সঙ্গে দুষ্কর্ম হচ্ছে। আদিবাসী মেয়ের সঙ্গে দুষ্কর্ম – বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরাধী কেউ না কেউ তৃণমূল নেতা হয় বা তৃণমূলের যোগ পাওয়া যায়। এখানকার নির্মম সরকার খোলাখুলি ধর্ষকদের সুরক্ষা দেয়। অপরাধীদের বাঁচাতে চায়। সন্দেশখালির ঘটনা, আরজিকর হাসপাতালে নৃশংসতা বাংলার মানুষ ভোলেনি। টিএমসি কীভাবে খোলাখুলি অপরাধীদের পাশে দাঁড়ায়। এই মানসিকতার পরিণাম আজ মহিলাদের বিরুদ্ধে অ্যাসিড অ্যাটাকের মত নির্মম ঘটনা এত বেশি করে পশ্চিমবঙ্গে হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ একসময়ে দেশের সবচেয়ে প্রগতিশীল রাজ্য ছিল। আজ সেখানে সন্ধ্যা হলেই মা মেয়েদের ফোন করে বলে – বাড়ি ফিরে এসো সন্ধ্যা নামার আগে। শক্তির পুজো করা বাংলা এমন অবস্থা মেনে নেবে না। বিজেপি সরকারে মহিলারা সুরক্ষিত থাকবেন, অপরাধীরা জেলে থাকবে। মোদির গ্যারান্টি।”
অনুপ্রবেশ ও দুর্নীতি (PM Modi Brigade Kolkata 2026)!
প্রধানমন্ত্রীর দাবি, “তৃণমূল সরকার গুন্ডা-অপরাধীদের টাকায় চলে। রংবাজি কাটমানিই তৃণমূলের আয়ের পথ। যেদিন বাংলার মানুষ সামনে আসবে তৃণমূলের পতন নিশ্চিত। এবার তৃণমূলকে বাঁচানোর কেউ নেই। এরা বাংলার মানুষদের ভয় দেখিয়ে হুমকি দিয়ে রেখেছে। তৃণমূল মাফিয়াদের পোষে। কট্টরপন্থীদের সংরক্ষণ দেয়। তৃণমূল নিজেদের শক্তি বাড়াতে অনুপ্রবেশকারীদের মদত দেয়। এই টিএমসি মা মাটি মানুষের স্লোগানে ক্ষমতায় এসেছিল। আজ সেই মা কাঁদছে। মাটি লুট করছে। বাঙালি, বাংলা ছাড়ছে।”
অনুপ্রবেশ ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “অনুপ্রবেশকারীদের জন্য রুটি, বেটি, মাটি, সবচেয়ে বিপদে রয়েছে। এরা বাংলার লোকেদের রোজগার কেড়ে নিচ্ছে। মা-বোনদের সুরক্ষা বিপদে। বাংলার মাটিতে এই অনুপ্রবেশকারীদের জোর বাড়ছে। এর পরিণাম সামনে। বাংলার বেশিরভাগ এলাকায় ডেমোগ্রাফি বদলেছে। বাঙালি হিন্দুদের সংখ্যালঘু বানানো হচ্ছে। তুষ্টি করণের খেলা হচ্ছে। শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা হলে তৃণমূল বিরোধিতা করে। তাদের নাগরিকত্বের বিরোধিতা করে। সেই হিন্দুদের ভোটব্যাঙ্ক মানে না। তাই তাঁরা এসআইআরের বিরোধ করছে। যাতে অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ না যায়। ভোটার লিস্ট শুদ্ধ না হয়। এরা তো মৃতদের নাম বের করতে দিতে চায় না। ডেমোগ্রাফি বদলের এই বিষয় বাংলাকে অসুরক্ষিত করেছে। আর এখন খোলাখুলি হুমকি দেওয়া হচ্ছে – খাস কমিউনিটির লোকজন মিলে খতম করে দেবে। সাংবিধানিক পদে বসে এমন কথা শোভা দেয় না। আমি জানতে চাই, তারা কারা যারা টিএমসি সরকারের ইশারায় কোটি লোককে খতম করবে। ধমকানো ভয় পাওয়ানোর রাজনীতিকে হাতিয়ার করেছে। ভোটে ভোটারদের হুমকি, সরকারি আধিকারিকদের হুমকি, মিডিয়াকে, বিরোধীদের হুমকি। বাংলায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাখতে চায়। তৃণমূল হুমকি দিয়ে বলছে, যারা তৃমমূলকে ভোট দেয় না তারা নাকি বাঙালি না। তৃণমূলকে ভোট না দিলে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা, বিদ্যুৎ, জল সব বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।”
বাংলার জঙ্গলরাজের কাউন্টডাউন শুরু: মোদি
প্রধানমন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “তৃণমূলের গুণ্ডামির দিন শেষ হতে চলেছে। তৃণমূলে সরকারের যাওয়ার কাউন্টডাউন শুরু। বাংলায় বিজেপি সরকার তৈরির পরে একদিকে আমরা সবার সাথ সবার বিকাশের মন্ত্রে চলব। আরেকদিকে সবার হিসেব নেব। তৃণমূলের গুন্ডারা যারা আপনাদের ভয় দেখায়, বিজেপি সরকারের আমলে তাদের ভয়ের দিন শুরু হবে। বিজেপি সরকারের আমলে ভয় পাবে অপরাধী, অনুপ্রবেশকারীরা, তুষ্টিকরণের রাজনীতিকদের ভয় পাবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। অপরাধীদের একটাই জায়গা হবে- জেল।”
রাষ্ট্রপতির অসম্মানে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী (PM Modi Brigade Kolkata 2026)
প্রধানমন্ত্রীর কথায়, “বাংলার নির্মম সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি প্রতারিত দলিত। আদিবাসী আমাদের গরিব ভাইবোনরা। আদিবাসী সমাজের সঙ্গে কেমন অন্যায় হয় সেটা দেখা গেছে। তৃণমূল সরকার সব সীমা পার করেছে। কিছুদিন আগে মহামহিম রাষ্ট্রপতি আদিবাসী সমাজের মেয়ে, আদরনীয় দ্রৌপদী মুর্মু বাংলায় এসেছিলেন সাঁওতালদের অনুষ্ঠানে সামিল হতে। তৃণমূল সরকার সেই কার্যক্রমের বিরোধিতা করেছে। তৃণমূল রাষ্ট্রপতির সম্মান দিতে পারেনি। দ্রৌপদী মুর্মু যিনি নিজের সরলতার জন্য পরিচিত, তিনি দুখী মনে খেদ ব্যক্ত করেছেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি নিজের সমস্যার কথা বলেছেন। তৃণমূলকে মনে রাখতে হবে উনি কেবল দ্রৌপদী মুর্মুজির অপমান করেনি। তাঁরা কোটি কোটি আদিবাসীর অপমান করেছে। দেশের সর্বোচ্চ পদের অপমান, সংবিধানের অপমান করেছে। নির্মম সরকার জবাব পাবে।
আরও পড়ুন-
Shamik Suvendu Speech Brigade : ব্রিগেডে মোদি, লক্ষ্য বাংলা দখল! নির্বাচনের আগে ব্রিগেড সমাবেশে শুভেন্দু শামীকের বড় বার্তা
PM Modi Kolkata: কলকাতায় ১৮,৬৮০ কোটি টাকার প্রকল্পের উপহার মোদির, রেল, সড়ক ও বন্দর প্রকল্পের মাধ্যমে খুলবে নতুন কর্মসংস্থানের পথ

বিজেপির সপ্তাহব্যাপী ‘পরিবর্তন সংকল্প যাত্রা’র এদিন সমাপ্তি হল এই ব্রিগেডের সভার মাধ্যমে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্রিগেডের ভিড় এবং প্রধানমন্ত্রীর আগ্রাসী মেজাজ ২০২৬-এর লড়াইয়ে বিজেপি কর্মীদের মনোবল কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।

