jemimah rodrigues
Bengal Liberty: কখনও কখনও একটি নাম-ই সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠে। যখন ধূসর হয়ে আসে আকাশ, তখন সেই নাম-ই আলো জ্বালে মানুষের বিশ্বাসে।
ভারতের মহিলা ক্রিকেটে আলোকের ঝর্ণাধারার নাম —জেমাইমা জেসিকা রদ্রিগেজ।
নিঃশব্দ পরিশ্রম, অবিচল বিশ্বাস, অদম্য লড়াইয়ে বছর পঁচিশের মেয়েটি প্রমাণ করেছেন—
স্বপ্ন শুধু দেখা নয়, তাকে বাস্তবায়িত করা, বাঁচিয়ে রাখাই প্রকৃত শিল্প।
তখনও নিস্তব্ধ ভোরের মুম্বই।
রাস্তার বাতিস্তম্ভের আলো তখনও নেভেনি। এক কোণে নেট প্র্যাকটিসে চলছে। ডান হাতি এক মেয়ের ব্যাটের আওয়াজ ভেসেছে মৃদু মৃদু।
তার সঙ্গে মিশে আছে এক তাঁর কণ্ঠ আর নিঃশ্বাস —
যে সকালগুলো ভালোবেসে নিজের স্বপ্ন বুনেছে।
মেয়েবেলায় তার বন্ধুরা যখন পুতুল খেলছে, পুতুল সাজাচ্ছে আর তার হাতে ব্যাট। যা শুধুমাত্র একটি কাঠের অংশ নয়। মেয়েটির নিজের জীবনের দণ্ডায়মান স্বপ্ন।
ডান হাতে শুধু মাত্র ব্যাট নয়। দলের প্রয়োজনে ডান হাতে অফ ব্রেকও করতে পারেন।
শুধুমাত্র ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত হওয়া নয়। হকি স্টিক হাতেও মাঠে নেমেছেন। ক্রিকেট, হকির সঙ্গে বাস্কেটবল, ফুটবলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল মহারাষ্ট্রের ভান্দুপে জন্ম গ্রহণ করা মেয়েটির।
জেমাইমা জানতেন, মেয়েদের ক্রিকেটে ভিড় করে না সার্চ লাইট। আস্থা দেখান না পড়শিরা। খোঁজ করেন না বেশিরভাগ ভারত ক্রিকেট-জনতা।
তবুও এগিয়েছেন।
যখন কেউ বলেনি ‘তুমি পারবে’,
কিন্তু খ্রিষ্টান পরিবারের মেয়েটি নিজেকেই বারবার বলেছে—’আমাকে পারতেই হবে।’
তার বাবা, তার প্রথম কোচ ইভান দেখেছিলেন —
এক ছোট্ট মেয়ের চোখের তীব্রতা, যা একদিন বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেবে।
কিন্তু পথটা সহজ ছিল না।
দলে সুযোগ পাওয়া, আবার ছিটকে যাওয়া, ব্যাটে রানের খরা, সমালোচনা, হতাশা, বেদনা—
সব পেরিয়ে সে মেয়েটা নিজেকে গড়েছেন আগুনের মতো দৃঢ়তায়। একদিন বলেছিলেন, ‘ভাবছিলাম ক্রিকেট ছেড়ে দেব।’
হয়তো সেই সময়েই তাঁর ঈশ্বর নতুন এক অধ্যায়ের জন্য তাঁকে প্রস্তুত করছিল।
ফিরে আসার অর্থ শুধুমাত্র আবার টিমে জায়গা করা নয়, ফিরে আসা মানে নিজেকে নতুন করে চেনা।
জেমাইমা ফিরেছিলেন এক অন্যরকম শক্তি নিয়ে, যা পারেন স্বপ্ন বাস্তবায়নে ধাক্কা খেতে খেতে আবার ঘুরে দাঁড়ানো মানুষগুলিই।
নভি মুম্বইয়ের ডি ওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার রাতে অস্ট্রেলিয়ার ৩৩৮ রান তাড়া করতে গিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে শেফালি বর্মা আর স্মৃতি মন্ধানার সাজঘরে ফিরে যাওয়া। তারপরে চাপ, প্রত্যাশা, ইতিহাস লেখা—সবটা একসঙ্গে ছিল তাঁর আর হরমনপ্রীতের কাঁধে। গার্ডনারের অনবদ্য ক্যাচে ৮৯ রানেই থামেন ভারত অধিনায়ক। সব দায়িত্ব পড়ল ২০১৮ সালের ১২ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একদিনের ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া মেয়েটার উপর।
তিনি থাকলেন এক্কেবারে শান্ত। শতরানের পরেও উচ্ছ্বাস নেই।
বল এল, ব্যাট ঘুরল আর সেই মুহূর্তেই যেন সারা মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আলো।
চার!
কিন্তু তা শুধু রান নয়—
একটি জাতির দীর্ঘ প্রতীক্ষিত গর্বের প্রতিধ্বনি।
প্রতিটি শটে জেমাইমা, হরমন প্রীত, রিচা, দৃপ্তিরা বলছিলেন, ‘তারা জেতে। ইতিহাসও লেখে।’
ম্যাচ শেষে যখন জেমাইমার চোখ আবেগে ভেসে যাচ্ছিল, তা জল ছিল না—ছিল আলো।
একটা মেয়েই জানেন, কত অন্ধকার ভেদ করে এই আলোর ছটায় পৌঁছানো যায়।
ভারত শুধুমাত্র ফাইনালে ওঠেনি, উঠেছে এক নতুন বিশ্বাসের সিঁড়িতে। আর সেই সিঁড়ির প্রথম ধাপেই খোদাই হয়ে গেল একটি নাম — জেমাইমা রদ্রিগেজ।
তার ব্যাটের শব্দে বেজেছে
এক সুর,
যা শুধু ক্রিকেট নয়—
এটা আশার সুর, সাহসের সুর,
যা প্রতিটি মেয়েকে বলে,
‘তুমি আলো হতে পার, যদি অন্ধকারে বিশ্বাস না হারাও।’
জেমাইমা এখন কেবল একজন ক্রিকেটার নন।
তিনি এক গল্প, এক যাত্রা, এক আলো।
তাঁর ইনিংসটি মনে করাল,
সফলতা কোনও এক দিনের অলৌকিকতা নয়,
তা জন্ম নেয় রাতের অন্ধকার, পরিশ্রম আর অগণিত ছোট ছোট হারের ভিতর থেকেই।
শুধু ক্রীড়া জগতেই নয়,
অনুপ্রেরণার বাক্যেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে —
‘জেমাইমা’—
যে মেয়ে আলো দিয়ে নিজের ভাষা তৈরি করেছেন,
প্রমাণ করেছেন—
স্বপ্নকে ভালোবাসা মানেই নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়া, নিজেকে অতিক্রম করা।

