ঊষান ঘোষ, Bengal Liberty:
ভাল-মন্দের সঙ্গে জড়িয়ে
উত্তর ভারতের পরিবেশের ওঠাপড়া
আরাবল্লি তো শুধু মাত্র পর্বতশ্রেণী নয়—এ এক জীবন্ত ইতিহাস। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন পর্বতশ্রেণী। বয়স যার প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি বছর। অনেকের মতে, আরও বেশি (Aravalli Hills)।
সভ্যতার নানা উত্থান পতনের সাক্ষী থাকলেও আজ আরাবল্লি নিজেই অস্তিত্বের সংকটে। তা প্রাকৃতিক ক্ষয় না কি রাষ্ট্র-সমর্থিত উন্নয়নের আঘাত — তা নিয়ে চর্চা চলছে।
গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা এবং দিল্লি—এই চারটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনিক সীমারেখার মধ্যে বন্দি আরাবল্লি শুধুমাত্র পাথরের স্তূপ নয়। এটা উত্তর ভারতের পরিবেশের ভারসাম্যের মেরুদণ্ড। সেখানকার প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেওয়ালও বটে।

মরুভূমির বিস্তার ঠেকানো, ভূগর্ভস্থ জল ধরে রাখা, দিল্লি-এনসিআরের দূষণ রোধ—সব ক্ষেত্রেই আরাবল্লির ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ কাগজে-কলমে ‘পাহাড়’ নয় বলে তাকে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা চলছে।
এহেন বিতর্কের পিছনে রয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত কমিটির একটি সুপারিশ। যেখানে বলা হয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০০ মিটারের নিচে উচ্চতা হলে তা আর পাহাড়শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নয়। এই সংজ্ঞা আরাবল্লির ক্ষেত্রে নির্ধারিত হলে এক নির্মম বাস্তবতা সামনে আসে। আরাবল্লির বড় অংশই যে অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার, প্রাচীন ও ক্ষয়প্রাপ্ত!
কমিটির সুপারিশ কার্যকর হলে হাজার হাজার হেক্টর পাহাড়ি অঞ্চল ‘নন-হিল’ হয়ে যাবে। খুলে যাবে খনন-প্রভাবশালী আর রিয়েল এস্টেট লবির দরজা। যদিও অনেকে বলছেন, এত শিল্পায়নের দরজা!
এই ১০০ মিটারের সংজ্ঞা কার জন্য? প্রকৃতির? নাকি কর্পোরেট-প্রভাবশালীদের নানা সহায়তার সঙ্গে জড়িয়ে তা?
আরাবল্লি হিমালয় নয়, তা ঠিক। কিন্তু এভাবে প্রাচীন, ক্ষয়প্রাপ্ত পাহাড়ের অস্তিত্ব মুছে দেওয়া যায়?
পাহাড় কি শুধুই উচ্চতার মাপে বিচার্য হবে? ভূতাত্ত্বিক গঠন, পরিবেশগত ভূমিকা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তার পরিচয়ের অংশ হিসাবে বিবেচিত হবে না? প্রশ্ন কোনও কোনও কোনও আলোচকের?
অনেকে আরেক ধাপ এগিয়ে বলছেন — ভূতত্ত্ব কি রিয়েল এস্টেটের ব্রোশিওর অনুয়ায়ী লেখা হবে? পাহাড়ের পরিচয় কি এবার মাপা হবে বিল্ডারের স্কেলে?
পরিবেশবিদদের একাংশের আশঙ্কা, কমিটির সুপারিশ কার্যকর হলে প্রায় ৮০/৮৫ শতাংশ এলাকা আর পাহাড় হিসাবে স্বীকৃতি পাবে না।।
আরাবল্লিকে পাহাড় না বলা হলে অবৈধ খননকে বৈধতা দিতে সুবিধা হবে? বন ধ্বংসের পথ প্রশস্ত হবে? পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে? হরিয়ানা ও রাজস্থানে কয়েক দশক ধরে চলা খনন-রাজনীতির সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের যোগসূত্র কেউ কেউ খুঁজছেন। তাঁরা কি খুব ভুল করছেন?
অনেকের মধ্যে চর্চা চলছে —সংবিধানের ৪৮ এ এবং ৫১ (এ) জি ধারাকে মান্যতা দেবে না রাষ্ট্র? নাকি খনন-প্রভাবশালীদের মান্যতা দেবে?
আজ আরাবল্লিকে পাহাড় না বললে, কাল হয়তো বনকে বন বলা যাবে না!
আজ বলা হবে এটা পাহাড় নয়!
কাল বলা হবে এটা বন নয়!
পরশু বলা হবে এটা নদী নয়!
আরাবল্লি নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই —
রাষ্ট্র কি কর্পোরেটের কাছে আত্মসমর্পণ করছে? সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ কি পরিবেশ রক্ষার ঢাল হবে নাকি পাহাড় ধ্বংসের আইনি হাতিয়ারে পরিণত হবে?
যদিও কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণকে ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। সবটাই ঠিক থাকবে।
এহেন আবহে প্রশ্ন উঠছে, আরাবল্লি পর্বত চূর্ণ হলে শুধু পাথর ভাঙা পড়বে? আঘাত লাগবে শুধুই পাথরে?
আঘাত লাগবে না তো রাষ্ট্রের নৈতিকতার গায়ে?
ভাঙবে না তো জলবায়ু, জনজীবন আর আগামী প্রজন্মের অধিকার?
ইতিহাস এই প্রশ্ন করবে না তো — পাহাড় ভাঙার সময়ে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী ছিল? পাহাড় বাঁচানোর জন্য রাষ্ট্রের পদক্ষেপ কী ছিল?
