Iceland India TEPA Agreement
Bengal Liberty, কলকাতা, ৪ জুন: সুদূর আইসল্যান্ডের বরফ গলার সাথে জড়িয়ে আছে কলকাতার ভবিষ্যৎ (Iceland India TEPA Agreement)। আজ সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটিতে (SNU) আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং নেপালে নিযুক্ত আইসল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত মহামান্য বেনেডিক্ট হোসকুল্ডসন (HE Benedikt Hoskuldsson) স্পষ্ট ভাষায় জানান, আইসল্যান্ডের জলবায়ু বিপর্যয় আক্ষরিক অর্থেই কলকাতার অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রাক্কালে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর শ্রী সত্যম রায়চৌধুরী এবং প্রো-চ্যান্সেলর প্রফেসর (ডক্টর) ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায় সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।

হিমবাহের মৃত্যু এবং অস্তিত্বের সংকট (Iceland India TEPA Agreement)
ঠাসা অডিটোরিয়ামে বক্তব্য রাখার সময় রাষ্ট্রদূত হোসকুল্ডসন বলেন, “জলবায়ু সংকট আজ আমাদের ভৌগোলিক দূরত্বকে মুছে দিয়ে এক সুতোয় বেঁধেছে। আইসল্যান্ড বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ দ্রুত গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। ২০১৯ সালে আমরা আমাদের হাজার বছরের প্রাচীন ‘ওকজোকুল’ (Okjökull) হিমবাহের চিরতরে হারিয়ে যাওয়া উপলক্ষে কোনো প্রেস কনফারেন্স করিনি, বরং একটি প্রতীকী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আয়োজন করেছিলাম।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, হিমবাহ ছাড়া আইসল্যান্ডের ভূপ্রকৃতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি ভাবাই যায় না। এই ক্ষতি কোনো রূপক নয়, এটি আক্ষরিক অর্থেই এক অস্তিত্বের লড়াই।

আইসল্যান্ডের বরফ গলা ও কলকাতার বিপদ (Iceland India TEPA Agreement)
রাষ্ট্রদূত সরাসরি কলকাতার ভৌগোলিক অবস্থানের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “আইসল্যান্ডের গলে যাওয়া হিমবাহের জল বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের জলস্তর বাড়িয়ে দিচ্ছে। কলকাতা গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত এবং এটি বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম প্রধান জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ শহর। এটি কোনো দূরবর্তী সংযোগ নয়। আইসল্যান্ডের জলবায়ু বিপর্যয় সরাসরি কলকাতার জলস্তর বাড়িয়ে শহরটিকে হুমকির মুখে ফেলছে। তাই আইসল্যান্ডের জলবায়ু সাফল্য আসলে কলকাতারই স্বার্থ।”
সমস্যা নয়, সমাধান নিয়ে হাজির আইসল্যান্ড
Climate Change: আইসল্যান্ডের হিমবাহ গললে কলকাতায় কী হবে? | SNU | Bengal Liberty#climatechange #iceland #kolkatanews #SisterNiveditaUniversity #SNU #BengalLiberty pic.twitter.com/ap0y3NBlNX
— Bengal Liberty (@bengalliberty1) June 3, 2026
তবে আইসল্যান্ড শুধু সংকটের কথা বলতে আসেনি, এনেছে নিশ্চিত সমাধান। রাষ্ট্রদূত জানান, আইসল্যান্ড তাদের ১০০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ভূ-তাপীয় (geothermal) এবং জলবিদ্যুৎ শক্তি থেকে। এটি কেবল শক্তির গল্প নয়, এটি আসলে গভীর ভূ-তাত্ত্বিক প্রকৌশলের অভাবনীয় সাফল্য।
ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল, বিশেষ করে লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড এবং হিমালয়ের পাদদেশে প্রচুর ভূ-তাপীয় সম্ভাবনা রয়েছে। আইসল্যান্ড এই বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগানোর প্রযুক্তিগত দক্ষতা ভারতের সাথে ভাগ করে নিতে প্রস্তুত।

কার্বন ক্যাপচারিং ও সবুজ জ্বালানির নতুন দিগন্ত (Iceland India TEPA Agreement)
আইসল্যান্ডের দ্বিতীয় প্রধান অস্ত্র হলো তাদের উন্নত ‘কার্বন ক্যাপচারিং’ প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই অক্সাইড ধরে এনে ব্যাসিল্ট পাথরের মধ্যে ইনজেক্ট করা হয়, যা মাত্র দুই বছরের মধ্যে খনিজ পদার্থে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
এখানেই শেষ নয়, এই সংগৃহীত কার্বন ডাই অক্সাইডকে গ্রিন হাইড্রোজেন এবং অ্যামোনিয়ার সাথে মিশ্রিত করে মিথানলে রূপান্তর করা সম্ভব, যা একটি অত্যন্ত মূল্যবান বাণিজ্যিক জ্বালানি। ভারতের সাথে এই প্রযুক্তিগত আদান-প্রদান খুব শীঘ্রই শুরু হতে চলেছে।

TEPA চুক্তি ও ভারত-আইসল্যান্ডের কৌশলগত বন্ধুত্ব (Iceland India TEPA Agreement)
বিগত ১৪ বছরের দীর্ঘ ও ধৈর্যশীল আলোচনার পর আইসল্যান্ড ও তার ইএফটিএ (EFTA) অংশীদাররা ভারতের সাথে যৌথ অর্থনৈতিক রুটের একটি মজবুত কাঠামো তৈরি করেছে। ‘টেপা’ (TEPA) চুক্তি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, “এই চুক্তিটি প্রযুক্তি হস্তান্তর, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি এবং ফার্মা, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ক্লিন এনার্জির মতো ক্ষেত্রগুলোকে কভার করে—যা মূলত সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটিরও মূল পাঠ্য বিষয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “নর্ডিক দেশগুলো ভারতকে কোনো দূরবর্তী অংশীদার মনে করে না, বরং সমকক্ষ মনে করে। বিশ্বের বৃহত্তম জনসংখ্যা ও দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি নিয়ে ভারত আজ গ্লোবাল অর্ডারের কেন্দ্রবিন্দুতে। ভারত এমন এক অংশীদার যা আধিপত্য বিস্তার না করেও নিজের বিশালত্ব বজায় রাখতে পারে—যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা চীন কেউই দিতে পারবে না।”

পরিবেশ দিবসের প্রাক্কালে নতুন আশার আলো (Iceland India TEPA Agreement)
আইসল্যান্ডের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর শ্রী সত্যম রায়চৌধুরী বলেন, “টেকসই উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে আইসল্যান্ডের নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ঠিক প্রাক্কালে এই সফর আমাদের ছাত্র এবং শিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এই আলোচনা দুই দেশের মধ্যে নতুন একাডেমিক ও গবেষণা অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করবে।”
সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-চ্যান্সেলর প্রফেসর (ডক্টর) চট্টোপাধ্যায় বলেন, ওসলো সামিট এবং ভারত ও আইসল্যান্ডের মধ্যে লাগাতার সংলাপ দুই দেশকে পরিবেশ ও জলবায়ুর মতো জরুরি ইস্যুতে অত্যন্ত কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ দিবস উদযাপনের মঞ্চে এই আলোচনা আগামী দিনে এক নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে।

