Bengal Liberty : নয়ন বিশ্বাস রকি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজসেবক মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কর্মী
দেশে নীরবে ধেয়ে আসছে ক্ষুধার ভয়াবহ ঢেউ। গত এক দশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল হলেও সেই অর্জন এখন উল্টো পথে হাঁটছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, এভাবে চলতে থাকলে দেশের আরও ৬ কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাবে এবং চরম অনাহারের মুখে পড়বে।
বিশ্বব্যাংকের Bangladesh Development Update October 2026 প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালে ছিল ১৮.৭%। সেই হার ২০২৬ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২.৫% এ। অর্থাৎ গত চার বছর ধরে টানা দারিদ্র্য বাড়ছে। শুধু গত অর্থবছরেই নতুন করে ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
আরও খবর
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এই মুহূর্তে দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে ঝুলে আছে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ। যে কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অসুস্থতায় তারা মুহূর্তেই দারিদ্র্যের অতলে তলিয়ে যাবে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই ৬২ মিলিয়ন মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকিতে আছে।
কেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি
বিশ্বব্যাংক তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও স্থবির মজুরি: গত ৫৬ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি। অর্থাৎ বাজারে জিনিসের দাম যেভাবে বাড়ছে, মানুষের আয় সেভাবে বাড়ছে না। অক্টোবরের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪৭.৪২% পরিবার দৈনন্দিন খরচ চালাতে ঋণ করতে বাধ্য হচ্ছে। গ্রামে এই হার ৫১.৯১%। মানুষের গড় মাসিক আয় ৩৩,৫১৩ টাকা, কিন্তু ব্যয় ৩৫,৩১১ টাকা। আয় থেকে ব্যয় বেশি।
কর্মসংস্থানের সংকট: জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪% এ নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের গড় ৫.৬% এর চেয়ে অনেক কম। বেসরকারি বিনিয়োগ, জ্বালানি সংকট ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে কল-কারখানা বন্ধ হচ্ছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
অসমতা ও ভুল ভর্তুকি নীতি
দেশ জিডিপির প্রায় ৩.৫% ভর্তুকিতে খরচ করে, কিন্তু তার বড় অংশ ধনীদের কাছে যায়। শুধু বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় অর্ধেকই পায় শহরের সবচেয়ে ধনী পরিবারগুলো। আর দেশের সবচেয়ে গরীব অর্ধেক পরিবারই কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নেই।
নতুন গরীব কারা?
প্রতিবেদন বলছে, দেশে এক শ্রেণীর ‘নতুন গরীব’ তৈরি হয়েছে। তারা কাগজে-কলমে দারিদ্র্যসীমার ওপরে, কিন্তু বাস্তবে তারা খাবারের মান কমিয়ে দিচ্ছে, পুষ্টিকর খাবারের বদলে শুধু ভাত-রুটি খাচ্ছে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে, সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করে দিচ্ছে।
২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছিল। সেই অর্জন এখন চার বছরের ব্যবধানে ধূলিসাৎ হতে বসেছে। ২০২২ সালে ১৮.৭% থেকে ২০২৩ সালে ১৮.৯%, ২০২৪ সালে ২০.৫% এবং ২০২৫ সালে ২১% ছাড়িয়ে এখন ২২.৫%।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, সংস্কার না হলে আগামী অর্থবছরে এই হার ২২.৯% পর্যন্ত উঠতে পারে।
অর্থাৎ, যদি জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং দরিদ্রদের জন্য সঠিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে ২০১০ সালের ৩৭.১% দারিদ্র্যের বাংলাদেশে আমরা আবার ফিরে যাব। ৬ কোটি মানুষ আজ দু’বেলা খাবারের জন্য লড়ছে – কাল সেই লড়াই ১২ কোটিতে পৌঁছাতে সময় লাগবে না।


