Bengal Liberty : বিড়ির ধোঁয়া, অভাব আর বঞ্চনাকে সঙ্গী করেই মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর মহকুমার ১৮ জন ছেলেমেয়ে এবার নিটে সাফল্যের নজির গড়েছেন (Murshidabad)। কারও বাবা দিনমজুর, কারও মা সারাদিন বিড়ি বাঁধেন। কারও ঘরের চাল ফুটো, কারও মাথার উপর গঙ্গাভাঙনের আতঙ্ক। কোচিংয়ের সামর্থ্য ছিল না, দামি বই কেনার সুযোগও সীমিত। তবুও হার মানেননি তাঁরা। কখনও হ্যারিকেনের আলোয়, কখনও ইউটিউবের ভরসায়, কখনও পুরনো নোটস ঘেঁটে চলেছে ডাক্তার হওয়ার প্রস্তুতি। সেই লড়াইয়ের ফলেই এবার বিড়ি শ্রমিক পরিবারের ১৮ সন্তান জায়গা করে নিয়েছেন মেডিক্যালের দরজায়। অভাব তাঁদের পথ আটকে দিতে পারেনি, বরং লড়াইয়ের জেদ আরও শক্ত করেছে (Murshidabad)।

বিড়ির গন্ধ মেখে বড় হওয়া (Murshidabad)
মুর্শিদাবাদ মানেই বিড়ি শিল্প। এই জেলার অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই শিল্প। বেসরকারি হিসাবে প্রায় ১৫ লক্ষ এবং সরকারি হিসাবে প্রায় ৭ লক্ষ মানুষের জীবিকা এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তার সঙ্গে রয়েছে গঙ্গাভাঙন, পরিযায়ী শ্রমিকের জীবন এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক অনটন। এমন প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও এ বছর মুর্শিদাবাদ থেকে ১২৩ জন নিটে সফল হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জঙ্গিপুর মহকুমার কৃতী ৫০ জন। রঘুনাথগঞ্জ থেকে ২০, সামশেরগঞ্জ থেকে ১৫, সুতি থেকে ৯, ফরাক্কা থেকে ৫ এবং সাগরদিঘি থেকে ১ জন নিটে সফল হয়েছেন।
স্বপ্ন এবার শুধু স্বপ্ন নয় (Murshidabad)
এই ৫০ জনের মধ্যেই রয়েছেন বিড়ি শ্রমিক পরিবারের ১৮ জন। তাঁদের সাফল্য তাই শুধু ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, মুর্শিদাবাদের প্রান্তিক পরিবারের কাছে নতুন আশার গল্প। সামশেরগঞ্জের জোতকাশীর মীজানুর রহমানের নিট র্যাঙ্ক ৯৭৬০। বাবা দিনমজুর, মা বিড়ি শ্রমিক। ছয় ভাই ও দুই বোনের সংসারে তিনি পঞ্চম সন্তান। পরিবারের অন্য ভাইয়েরাও রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। কোচিং নেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। তাই রাত ১২টা পর্যন্ত ইউটিউবের ক্লাস এবং পুরনো নোটস ভরসা করেই পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছেন মীজানুর।
আরও খবর
উত্তর চাচন্ডের সুমা খাতুনের লড়াইটাও কম কঠিন নয়। তাঁর নিট র্যাঙ্ক ১৬৬৮৯। বাবা ফুটপাথে ব্যবসা করেন, মা বিড়ি বাঁধেন। তার উপর মাথার উপর সবসময় গঙ্গাভাঙনের আতঙ্ক। বৃষ্টির দিনে ভাঙা ঘরের চাল দিয়ে জল পড়ত। সেই ঘরেই হারিকেনের আলোয় বই খুলে বসতেন সুমা। পাশের ঘরে চলত বিড়ি বাঁধার কাজ, চারপাশে বিড়ির গন্ধ-আর তার মধ্যেই মেডিক্যালের স্বপ্নে ডুবে থাকতেন তিনি।

লড়াইয়ের গল্পে একই সুর (Murshidabad)
এই সাফল্যের তালিকায় আরও রয়েছে সামশেরগঞ্জের তানভীর, যাঁর নিট র্যাঙ্ক ২০০। রঘুনাথগঞ্জের মাহামদুলের র্যাঙ্ক ৪৫৪৪। হাসিবাতুন নেশা ১০৮৪৯ এবং মাসিদুর হোসেন ৫৪৭৫ র্যাঙ্ক করে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। প্রতিটি সাফল্যের নেপথ্যেই রয়েছে একই ছবি-অভাবের সঙ্গে লড়াই, সীমিত সুযোগের মধ্যে পড়াশোনা এবং পরিবারের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন করে নেওয়া। যে ঘরে দিনের পর দিন বিড়ি বাঁধার শব্দ শোনা যায়, যে পরিবারে সংসার চালানোই কঠিন, সেই ঘর থেকেই এবার বেরিয়ে আসছে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন।
এই ১৮ জনের সাফল্য তাই শুধু নিটের একটি ফলাফল নয়। এটি প্রমাণ করে, সুযোগ সীমিত হলেও স্বপ্নের পরিধি সীমিত নয়। মুর্শিদাবাদের বিড়ি মহল্লার সেই ঘরগুলিতে হয়তো এখনও অভাব রয়েছে, হয়তো এখনও গঙ্গাভাঙনের ভয় রয়েছে। কিন্তু সেই ঘরগুলির সন্তানরা দেখিয়ে দিয়েছেন-লড়াই করার জেদ থাকলে ধোঁয়ায় ঢাকা জীবন থেকেও সাদা অ্যাপ্রনের স্বপ্ন দেখা যায়, আর একদিন সেই স্বপ্ন সত্যিও করা যায়।
আরও পড়ুন :
https://bengalliberty.com/2026/08/20/tulu-mondal-13/


