Payal Nag Wins Gold for India
Bengal Liberty, Kolkata:
মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতা কি তার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে? এই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর নতুন করে লিখে দিলেন ওড়িশার ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী—পায়েল নাগ (Payal Nag Wins Gold for India) । যার দু’টি হাত নেই, নেই দু’টি পা-ও। কিন্তু আছে অদম্য এক ইচ্ছাশক্তি আর লক্ষ্যভেদের একাগ্রতা। ব্যাংককে আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড আর্চারি প্যারা সিরিজ’-এ জোড়া সোনা জিতে পায়েল প্রমাণ করলেন, প্রতিকূলতা যত বড়ই হোক, লড়াকু মানসিকতার কাছে তা হার মানতে বাধ্য। আজ গোটা দেশ তাঁকে কুর্নিশ জানাচ্ছে; তিনি এখন কেবল একজন অ্যাথলেট নন, ভারতের অগণিত মানুষের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।

অভিশপ্ত সেই দিন এবং জীবনের লড়াই (Payal Nag Wins Gold for India)
পায়েলের সাফল্যের এই মুকুটে যে পালক আজ দেখা যাচ্ছে, তার পিছনের গল্পটা ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। ওড়িশার বলাঙ্গির জেলার এক অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম পায়েলের। বাবা বিজয় কুমার নাগ পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। অভাবের সংসার হলেও ছোট্ট পায়েলের জীবন চলছিল আর পাঁচটা সাধারণ শিশুর মতোই। কিন্তু ২০১৫ সালে ঘটে যায় সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা। তখন পায়েল তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। রায়পুরের একটি নির্মীয়মাণ বাড়ির ছাদে খেলা করার সময় অসাবধানতাবশত একটি জীবন্ত বিদ্যুৎবাহী তারে তাঁর হাত লেগে যায়। বৃষ্টিভেজা ছাদে সেই প্রবল বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঘটনায় পায়েলের জীবন তছনছ হয়ে যায়।

সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া আটকাতে চিকিৎসকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়—কেটে বাদ দিতে হয় তাঁর দুই হাত এবং দুই পা। চার-চারটি অঙ্গ হারিয়ে ছোট্ট পায়েল যখন শয্যাশায়ী, তখন চারপাশের পৃথিবীটা তাঁর কাছে বিষাদময় হয়ে উঠেছিল। দারিদ্র্যের কারণে চিকিৎসা চালানো এবং ছয়জনের বিশাল পরিবারের ভরণপোষণ ছিল অসম্ভব। আত্মীয়-পরিজনদের অনেকেই নির্মমভাবে বলেছিলেন, “এই মেয়ে না পারবে খেতে, না পারবে হাঁটতে… একে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলুন।” কিন্তু দারিদ্র্য আর অবজ্ঞা পায়েলের জেদকে মারতে পারেনি। শেষমেশ তাঁকে রাখা হয় ‘পার্বতী গিরি বাল নিকেতন’ অনাথ আশ্রমে। সেখানেই শুরু হয় তাঁর জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস।
কোচ কুলদীপ এবং আগামীর স্বপ্ন (Payal Nag Wins Gold for India)
পায়েলের জীবনের মোড় ঘোরে ২০২৩ সালে। বিখ্যাত কোচ কুলদীপ ভেদওয়ান সোশ্যাল মিডিয়ায় পায়েলের একটি ছবি দেখতে পান। হাত-পা বিহীন মেয়েটির চোখের তেজ দেখে কুলদীপ বুঝেছিলেন, এই মেয়েটির মধ্যে বিশেষ কিছু আছে। তিনি তাঁকে খুঁজে বের করেন এবং কাটরার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। প্রথম প্রথম পায়েল নিজেও ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি কোচকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “যেখানে হাতই নেই, সেখানে আমি তিরন্দাজি করব কীভাবে?” কোচ কুলদীপ শুধু বলেছিলেন, “তুমি শুধু পরিশ্রম করো, বাকিটা আমি দেখে নেব।”

এরপর শুরু হয় অবিশ্বাস্য এক যাত্রা। কোচের তত্ত্বাবধানে বিশেষভাবে তৈরি যন্ত্রের (Custom Device) মাধ্যমে পায়েলের কাঁধ এবং চোয়ালের শক্তির সমন্বয়ে তিরন্দাজি শেখানো শুরু হয়। প্রতিদিন প্রায় ৮ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম আর অনুশীলন। শারীরিক যন্ত্রণা উপেক্ষা করে পায়েল নিজেকে গড়ে তুলতে থাকেন। ২০২৫ সালে এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর অভিষেক ঘটে। ওয়ার্ল্ড আর্চারি সংস্থা তাঁকে বিশেষ যন্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিলে তিনি বিশ্বের প্রথম ‘কোয়াড্রাপল অ্যাম্পুটি’ (চার অঙ্গহীন) তিরন্দাজ হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
ব্যাংককে বিশ্বজয় ও শীতল দেবীকে হারানো (Payal Nag Wins Gold for India)
ব্যাংককের ওয়ার্ল্ড আর্চারি প্যারা সিরিজ ছিল পায়েলের জীবনের চরম পরীক্ষা। ফাইনালে তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন বিশ্বের ১ নম্বর প্যারা তিরন্দাজ শীতল দেবী। শীতল নিজেও বিশ্বখ্যাত, কিন্তু পায়েল সেদিন ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। এক শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে ১৩৯-১৩৬ পয়েন্টের ব্যবধানে শীতল দেবীকে হারিয়ে ব্যক্তিগত বিভাগে সোনা জেতেন পায়েল। শুধু তাই নয়, দলগত বিভাগেও ভারতের হয়ে সোনা জেতেন তিনি। এই প্রতিযোগিতায় ভারত মোট ১৬টি পদক জিতে তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে, যার অন্যতম কারিগর ওড়িশার এই কন্যা।
দেশজুড়ে প্রশংসা ও স্বীকৃতির জোয়ার (Payal Nag Wins Gold for India)
পায়েলের এই ঐতিহাসিক সাফল্যে মুগ্ধ হয়ে শিল্পপতি আনন্দ মাহিন্দ্রা সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, “সাহস, দৃঢ়তা আর ইতিবাচক ভাবনার প্রকৃত মানে বুঝতে হলে পায়েলকে দেখুন।” ওড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কও এই অসাধ্য সাধনের জন্য পায়েলকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। গোটা দেশের মানুষ আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় পায়েলের লড়াইকে কুর্নিশ জানাচ্ছে।
#Breaking: Payal Nag beats world No. 1 Sheetal Devi to win para archery gold in Bangkok
Wins 139–136 in final; later pairs with Sheetal for doubles gold as India tops medal tally.#JaagIndia #BreakingNews #ParaArchery #IndiaSports #Bangkok #Sports pic.twitter.com/rZ0F6zpDOv
— Jaag India (@thejaagindia) April 6, 2026
পায়েল নাগের এই জয় কেবল একটি পদক জয় নয়। এটি সেই মানসিকতার জয়, যা হার মানতে শেখেনি। রাজমিস্ত্রির মেয়ে থেকে অনাথ আশ্রম, আর সেখান থেকে বিশ্বজয়ের এই দীর্ঘ পথচলা আগামী প্রজন্মের অ্যাথলেটদের জন্য এক ধ্রুবতারা হয়ে থাকবে। পায়েল শিখিয়ে দিলেন, শরীর অক্ষম হতে পারে কিন্তু স্বপ্ন যদি আকাশছোঁয়া হয়, তবে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো কেবল সময়ের অপেক্ষা।
আজকের পায়েল নাগ সেই সব মানুষের গালে এক সজোরে চড়, যারা একসময় তাঁর পরিবারকে তাঁকে বিষ খাইয়ে মারার পরামর্শ দিয়েছিল। পায়েলের দু’টি হাত নেই ঠিকই, কিন্তু তাঁর অর্জিত দু’টি সোনার মেডেল আজ গোটা বিশ্বের সামনে ভারতের তেরঙ্গাকে গর্বের সাথে তুলে ধরেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, ভাগ্য আপনার হাত-পা কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু আপনার লক্ষ্যভেদের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। ওড়িশার এই লড়াকু মেয়েটির জয়যাত্রা কেবল শুরু, সামনে হয়তো আরও বড় ইতিহাস অপেক্ষা করছে।
আরও পড়ুন:
দিল্লি বিধানসভায় (Suspicious Car in Delhi Assembly) নজিরবিহীন নিরাপত্তা চ্যুতি: ভিআইপি গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকল রহস্যময় গাড়ি!
