Artemis 2 mission
Bengal Liberty Desk, Kolkata :
প্রায় অর্ধশতক পর মানবজাতির চন্দ্র অভিযানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরলেন Artemis 2-এর চার মহাকাশচারী Artemis 2 mission। উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা আর প্রযুক্তির কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত সফল হল এই মহাকাশযাত্রা। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ভয়ঙ্কর তাপ ও আগুনের লেলিহান শিখার মুখোমুখি হয়ে অবশেষে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করল তাঁদের ক্যাপসুল।
এই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের পুরো ঘটনাপ্রবাহ সরাসরি সম্প্রচার করে NASA, যা মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের নজর কেড়ে নেয়।

চাঁদের দুয়ারে গিয়ে ফিরে আসা Artemis 2 mission
এই অভিযানে অংশ নেওয়া চার মহাকাশচারী কম্যান্ডার রিড ওয়াইজ়ম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। চাঁদের মাটিতে নামেননি ঠিকই, কিন্তু তার কক্ষপথ ঘুরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে ফিরেছেন। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লক্ষ ৬ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে এই মিশন তৈরি করেছে নতুন রেকর্ড, যা আগের বহু ঐতিহাসিক অভিযানের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতে মানুষের চাঁদে অবতরণের পথ আরও মসৃণ করাই ছিল এই অভিযানের মূল লক্ষ্য।
.
The crew module on Orion has separated from its service module. After traveling around the Moon, seeing its far side, and experiencing a solar eclipse, the Artemis II astronauts are on the last leg of their trip home. pic.twitter.com/j9u5j1Noi9
— NASA (@NASA) April 10, 2026
বায়ুমণ্ডলে ঢুকতেই আগুনের বলয়
পৃথিবীতে ফেরার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্ত ছিল বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ। শব্দের গতির প্রায় ৩৩ গুণ বেগে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় শুরু হয় আসল পরীক্ষা। সেই মুহূর্তে Orion capsule সম্পূর্ণ অটোপাইলট মোডে ছিল, আর ভেতরে থাকা চার মহাকাশচারীকে নির্ভর করতে হচ্ছিল শুধুমাত্র প্রযুক্তির উপর। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন মোটেই সহজ ছিল না বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে ক্যাপসুলটির চারপাশে তৈরি হয় আগুনের প্রলয়ংকরী আবরণ। বাইরে তাপমাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে ক্যাপসুল কার্যত আগুনে ঢেকে যায় এবং তীব্র উত্তাপে তার বাইরের স্তর দগ্ধ হতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ছিল, এই সময় কোনও প্রযুক্তিগত সমস্যা হলে বড় বিপদ ঘটতে পারে। তবে সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে নিরাপদেই এগিয়ে যায় প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া।

জানা গেছে এই সংকটময় সময়েই ওই চারজনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় NASA-র সঙ্গে। প্রায় ছ’মিনিটের এই ‘ব্ল্যাকআউট’ ছিল মিশনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ধাপ। ২০২২ সালের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা থেকেই জানা ছিল, তাপপ্রবাহের ধাক্কায় ক্যাপসুলের বাইরের অংশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেতে পারে—চাঁদের পৃষ্ঠের মতোই গর্তে ভরে যেতে পারে তার গা। সেই স্মৃতি মাথায় রেখেই বাড়ছিল উৎকণ্ঠা—এই চরম তাপ সহ্য করে আদৌ নিরাপদে ফিরতে পারবে কি না Orion।
ফ্লাইট ডিরেক্টর দেফ ব়্যাডিগ্যানের আশঙ্কাও ছিল ঠিক এই সময়টাকে ঘিরেই—যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে শুরু করে প্যারাশুট খোলার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত কোনও অঘটন ঘটে কি না, তা নিয়ে টানটান উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে প্রতিটি সম্ভাব্য ঝুঁকির জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল পুরো টিম। উদ্ধারের জন্য সান ডিয়েগোর উপকূলে মোতায়েন ছিল মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ USS John P. Murtha। পাশাপাশি আকাশে টহল দিচ্ছিল সেনার বিমান ও হেলিকপ্টার। এই প্রস্তুতির চিত্র অনেকটাই মনে করিয়ে দেয় Apollo 17 অভিযানের সময়কার নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা। সবশেষে সমস্ত উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে সাফল্যের সঙ্গেই সম্পন্ন হয় উদ্ধার অভিযান। আগুন, তাপ আর অনিশ্চয়তার সেই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিরাপদেই পৃথিবীতে ফিরে আসেন চার
একাধিক সমস্যা, তবু অটুট মনোবল
১০ দিনের এই অভিযানে সবকিছু মসৃণ ছিল না। মাঝপথে ক্যাপসুলের পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা ও প্রপেল্যান্ট সিস্টেমে ত্রুটি ধরা পড়ে। এমনকি শৌচাগার ব্যবস্থাও কিছু সময়ের জন্য অকেজো হয়ে যায়। তবুও মনোবল হারাননি মহাকাশচারীরা। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে তাঁরা মিশনের লক্ষ্য পূরণে অটল ছিলেন, যা তাঁদের প্রশিক্ষণ ও মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ।
আবেগঘন মুহূর্ত ও বৈজ্ঞানিক সাফল্য
এই অভিযানে শুধু প্রযুক্তিগত সাফল্যই নয়, তৈরি হয়েছে বহু আবেগঘন মুহূর্তও। মহাকাশচারীরা চাঁদের অদেখা দিকের ছবি তুলেছেন, এমনকি মহাকাশ থেকে সূর্যগ্রহণের দৃশ্যও ধারণ করেছেন। পৃথিবীর অস্তমিত হওয়ার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করে তাঁরা মানবজাতিকে উপহার দিয়েছেন এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি।
সামনে Artemis 3—চাঁদে মানুষের প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি
এই মিশনের সাফল্যের পর এখন নজর Artemis 3-এর দিকে। আগামী ধাপে চাঁদের মাটিতে মানুষ নামানোর আগে আরও জটিল প্রযুক্তিগত মহড়া চালানো হবে। Artemis 2 প্রমাণ করে দিল মানুষ আবারও চাঁদের পথে ফিরতে প্রস্তুত। আর সেই যাত্রা শুধু প্রযুক্তির নয়, সাহস, ধৈর্য এবং অজানাকে জয় করার গল্পও বটে।
সবমিলিয়ে, আগুনের বৃত্ত পেরিয়ে, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি সামলে, অসাধারণ দক্ষতায় সম্পন্ন হল মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ অভিযান। Artemis 2 শুধু একটি মিশন নয় এটি ভবিষ্যতের চন্দ্রযাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর।
