Free Balochistan
Bengal Liberty
পাকিস্তানের সঙ্গে বালোচিস্তানের স্বাধীনতার(Free Balochistan) লড়াই আজকের নয়। বহু বছর ধরে পাকিস্তানের নির্মম শাসন থেকে মুক্তি পেতে চাইছে বালোচিস্তানের সাধারণ মানুষ। এবার সেই পথেই আরও একধাপ পা বাড়াল ‘বালোচ লিবারেশন আর্মি’ (BLA)।
দীর্ঘ লড়াই, টানাপোড়েন ও টালবাহানার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে স্বাধীনতার ঘোষণা করল বালোচিস্তান। সম্প্রতি এই সংক্রান্ত একটি লিখিত বিবৃতি সামনে এসেছে। বিবৃতিতে কোনো সংগঠনের নাম সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও অনুমান করা হচ্ছে, এটি বালোচ লিবারেশন আর্মিরই (BLA) ঘোষণা। সেখানে বালোচিস্তানকে ‘রিপাবলিক অফ বালোচিস্তান’ নামে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

৮৫ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে!(Free Balochistan)
সোশ্যাল মিডিয়ার একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে রাতারাতি শোরগোল পড়ে গেছে। সেই পোস্টে দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে বালোচিস্তানের প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা এখন বালোচ লিবারেশন আর্মির দখলে চলে এসেছে।
এর পাশাপাশি ওই পোস্টে নতুন দেশের জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতও প্রকাশ করা হয়েছে। আরও দাবি করা হয়েছে, বালোচিস্তানের সোনা ও তামার খনি, ১৫০টিরও বেশি প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি এবং ১,২০০টির বেশি কয়লাখনির নিয়ন্ত্রণ এখন সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় জনগণের হাতে। এখানেই শেষ নয়, নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বালোচিস্তানের নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাহিনীও গড়ে তোলা হয়েছে বলে দাবি বিদ্রোহীদের।

তাদের দাবি, প্রায় ৫ লক্ষ সদস্য বালোচিস্তানের মিলিটারি, নৌসেনা, বায়ুসেনা এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে কর্মরত রয়েছেন। বিদ্রোহীদের দাবি, বালোচিস্তানের যে অংশগুলোতে এখনও পাকিস্তানি সেনা রয়ে গেছে, ২০২৬ সালের মধ্যেই তাদের সেখান থেকে সম্পূর্ণভাবে হটিয়ে দেওয়া হবে। বর্তমানে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত বালোচ ও পশতুন সম্প্রদায়ের সদস্যরা দলে দলে পদত্যাগ করছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বালোচিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে বিদ্রোহীরা।
পাকিস্তান ও বালোচিস্তানের নির্মম ইতিহাস(Free Balochistan)
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বালোচিস্তান দেশটির বৃহত্তম (৪৪ শতাংশ এলাকা জুড়ে) অথচ সবচেয়ে কম জনবহুল একটি প্রদেশ, যা বিপুল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এর ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো এবং ঐতিহাসিকভাবে এটি ‘কালাত খানাত’সহ বিভিন্ন স্বাধীন অংশে বিভক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ সালে এই অঞ্চলটি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে প্রদেশটিতে বেশ কয়েকবার রাজনৈতিক সংঘাত ও সশস্ত্র বিদ্রোহ দেখা দেয়।
প্রাচীন ও মধ্যযুগ(Free Balochistan)
পারস্য সাম্রাজ্য, আলেকজান্ডারের অভিযান এবং আরব খিলাফতের শাসনাধীন এই অঞ্চলটিতে পঞ্চদশ শতাব্দীতে বেলুচ উপজাতিরা আধিপত্য বিস্তার করে। ১৮ শতকে কালাত রাজ্যের অধীনে বালোচিস্তান একটি সুসংগঠিত অঞ্চলে পরিণত হয়।

ব্রিটিশ আমল(Free Balochistan)
১৯ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশরা বর্তমান আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমান্তরেখা (ডুরান্ড লাইন) নির্ধারণ করে। কৌশলগত কারণে ব্রিটিশরা কালাত খানাত ও অন্যান্য অঞ্চলের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।
পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি(Free Balochistan)
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর কালাত রাজ্য সাময়িকভাবে স্বাধীন থাকলেও, ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি বাহিনী জোরপূর্বক এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং একে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করে।
বালোচদের বিদ্রোহ(Free Balochistan)
কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রতিবাদে ১৯৪৮ সাল থেকেই বালোচ জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে দফায় দফায় সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছে। দশকের পর দশক ধরে এই স্বাধীনতার লড়াই জারি রয়েছে।
ঐতিহাসিক ক্ষোভ ও অসন্তোষের কারণসমূহ(Free Balochistan)
ঐতিহাসিক ক্ষোভ(Free Balochistan)
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ‘স্টেট অফ কালাত’ (বর্তমান বালোচিস্তান) একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জোরপূর্বক অঞ্চলটি দখল করে নেয়, যা বালোচ জাতীয়তাবাদীরা আজও মেনে নিতে পারেনি।

অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সম্পদ লুণ্ঠন: বালোচিস্তান প্রাকৃতিক গ্যাস, সোনা, তামা এবং কয়লার মতো মূল্যবান সম্পদে পরিপূর্ণ। কিন্তু এসব সম্পদ উত্তোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার লাভবান হলেও, স্থানীয় বালোচ জনগণ চরম দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুম(Free Balochistan)
বালোচিস্তানের স্থানীয় সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকার হরণের পাশাপাশি পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। সন্দেহভাজন রাজনৈতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুম করার (Missing Persons) ঘটনা বালোচদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মেগা প্রজেক্টে স্থানীয়দের অবমূল্যায়ন চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) এবং গোয়াদার বন্দর নির্মাণে স্থানীয়দের স্বার্থ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। বেলুচদের আশঙ্কা, এসব প্রকল্পের ফলে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঘটবে এবং তারা নিজেদের ভূমিতেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।
আরো পড়ুন:-
Rahul Arunoday Banerjee: রাহুলের স্মৃতিতে শিল্পীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যবিমা উদ্যোগ আর্টিস্ট ফোরামের
ভারত ও বালোচিস্তানের সম্পর্ক(Free Balochistan)
ভারত ও পাকিস্তানের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বালোচিস্তান একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। পাকিস্তান সরকারের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—ভারত বালোচ লিবারেশন আর্মির (BLA) মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে এবং এই অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। তবে ভারত বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
পাকিস্তানের অভিযোগ ও কুলভূষণ বিতর্ক(Free Balochistan)
পাকিস্তানের দাবি, বালোচিস্তানে ভারতের সরাসরি গোপন মদদ রয়েছে। ২০১৬ সালে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রাক্তন কর্মকর্তা কুলভূষণ যাদবকে বালোচিস্তান থেকে গ্রেপ্তার করার দাবি করে পাকিস্তান এবং তাঁকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর গুপ্তচর হিসেবে অভিহিত করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তান প্রায়ই বালোচিস্তানে ভারতীয় হস্তক্ষেপের তথাকথিত প্রমাণ তুলে ধরার দাবি জানায়।

ভারতের অবস্থান(Free Balochistan)
ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বালোচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন করে না। তবে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বালোচিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং পাকিস্তানের দমনপীড়নের বিষয়টি ভারত আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও অতীতে বালোচিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
বিদ্রোহীদের এই চরম পদক্ষেপের পর শেষ পর্যন্ত কি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বালোচিস্তানের জন্ম হবে? এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই এখন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

