Maya Dolas
Bengal Liberty, সিদ্ধার্থ দে: মুম্বাইয়ের অপরাধ জগতের ইতিহাসে ১৯৯১ সালের ১৬ নভেম্বর দিনটি এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেই দিন লোখান্ডওয়ালা কমপ্লেক্সে যা ঘটেছিল, তা কেবল ভারতের আন্ডারওয়ার্ল্ডের সমীকরণ বদলে দেয়নি, বরং পুলিশের এনকাউন্টার স্পেশালিস্টদেরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল। এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মায়া ডোলাস।
এক উঠতি গ্যাংস্টারের উত্থানের কাহিনী (Maya Dolas)
মায়া ডোলাস (Maya Dolas), যার আসল নাম ছিল মহিন্দ্র ডোলাস, ১৯৬৬ সালে মুম্বাইয়ের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার জীবন সাধারণ ছিল না। খুব অল্প বয়সেই তিনি অপরাধ জগতের অন্ধকার গলিতে পা বাড়ান। মায়া ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং অত্যন্ত উগ্র মেজাজের। আশির দশকের শেষ দিকে মুম্বাইয়ের ডনদের নজরে আসতে শুরু করেন তিনি।
মায়ার বিশেষত্ব ছিল তার ভয়ডরহীনতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। এই গুণগুলোই তাকে ডি-কোম্পানির (D-Company) নজরে নিয়ে আসে।
দাউদ ইব্রাহিম ও ডি-কোম্পানির সাথে সম্পর্ক
সেই সময় মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড শাসন করতেন দাউদ ইব্রাহিম। দাউদ চাইতেন এমন কিছু তরুণ যোদ্ধা যারা সরাসরি পুলিশের চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে পারবে। মায়া ডোলাস এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী দিলীপ বুয়া (Dilip Buwa) দাউদের এই প্রত্যাশা পূরণ করেছিলেন।
* বিশ্বস্ত সেনাপতি: মায়া ডোলাস দ্রুত ডি-কোম্পানির একজন বিশ্বস্ত সেনাপতি হয়ে ওঠেন। দাউদ ইব্রাহিম তাকে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে তোলাবাজি (extortion) এবং শত্রু পক্ষকে দমানোর দায়িত্ব দেন।
* হত্যাকাণ্ড ও ত্রাস: দাউদের নির্দেশে মায়া বেশ কয়েকটি বড় হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন। শোনা যায়, দাউদ ইব্রাহিমের প্রতিপক্ষ গ্যাংস্টারদের খতম করার জন্য মায়া ছিলেন দাউদের অন্যতম প্রধান ‘হিটম্যান’।
* বিচ্ছেদ ও অবাধ্যতা: তবে কিছু সূত্রের দাবি, মৃত্যুর কিছু সময় আগে মায়া ডোলাস দাউদ ইব্রাহিমের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিলেন। তিনি নিজের আলাদা গ্যাং তৈরির পরিকল্পনা করছিলেন এবং দাউদের নির্দেশ অমান্য করতে শুরু করেছিলেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, মায়া এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠছিলেন যে দাউদ নিজেই পুলিশের কাছে তার অবস্থান ফাঁস করে দিয়েছিলেন।
১৯৯১-এর লোখান্ডওয়ালা কমপ্লেক্স শুটআউট
মুম্বাইয়ের আন্ধেরি এলাকার ‘লোখান্ডওয়ালা কমপ্লেক্স’ তখন একটি অভিজাত আবাসিক এলাকা। ১৯৯১ সালের ১৬ নভেম্বর দুপুরের দিকে সেই শান্ত এলাকাটি হঠাৎ করেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
ঘটনার সূত্রপাত (Maya Dolas)
মুম্বাই পুলিশ খবর পায় যে, লোখান্ডওয়ালা কমপ্লেক্সের ‘স্বাতী’ বিল্ডিংয়ের একটি ফ্ল্যাটে মায়া ডোলাস, দিলীপ বুয়া এবং তাদের দলের আরও কয়েকজন সদস্য আত্মগোপন করে আছে। তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আফতাব আহমেদ খান (A.A. Khan) এর নেতৃত্বে এটিএস (ATS) এবং মুম্বাই পুলিশের একটি বিশাল বাহিনী এলাকাটি ঘিরে ফেলে।
চার ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ
পুলিশ প্রথমে তাদের আত্মসমর্পণ করতে বলে, কিন্তু মায়া ডোলাস এবং তার সহযোগীরা পুলিশের ওপর একে-৪৭ রাইফেল থেকে বৃষ্টির মতো গুলি চালাতে শুরু করে। এটি কোনো সাধারণ এনকাউন্টার ছিল না; এটি ছিল একটি পুরোদস্তুর সম্মুখ যুদ্ধ।
* মায়া ডোলাস ভবনের ছাদ এবং জানালা থেকে পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
* প্রায় ৪০০ পুলিশ সদস্য এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন এবং কয়েক হাজার রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়েছিল।
* আশেপাশের সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ঘরের ভেতর লুকিয়ে পড়েন। মিডিয়াও এই প্রথম লাইভ কভারেজের মতো করে কোনো এনকাউন্টার প্রত্যক্ষ করে।
মায়া ডোলাসের মৃত্যু: এক হিংস্র পরিণাম
দীর্ঘ চার ঘণ্টা লড়াই চলার পর পুলিশের গুলিতে মায়া ডোলাস এবং দিলীপ বুয়াসহ মোট সাতজন গ্যাংস্টার নিহত হয়।
মায়া ডোলাসের মৃত্যু ছিল অত্যন্ত বীভৎস। পুলিশের বুলেটে তার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই শেষ হয়ে যায় এই দুর্ধর্ষ গ্যাংস্টারের জীবন। এই এনকাউন্টারটি ভারতের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত এবং আলোচিত ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেকে মনে করেন, এটি কেবল পুলিশের বীরত্ব ছিল না, বরং দাউদ ইব্রাহিম নিজের পথের কাঁটা সরাতে পুলিশকে ব্যবহার করেছিলেন।
মায়া ডোলাসের লিগাসি ও পপ কালচার
মায়া ডোলাসের এই কাহিনী সাধারণ মানুষের মনে এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে, ২০০৭ সালে বলিউড পরিচালক সঞ্জয় গুপ্তা এই ঘটনা নিয়ে “Shootout at Lokhandwala” নামে একটি সিনেমা তৈরি করেন।
* এই সিনেমায় বিবেক ওবেরয় মায়া ডোলাসের চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।
* সিনেমাটি দেখায় কীভাবে একজন মেধাবী ছাত্র পরিস্থিতির চাপে পড়ে অপরাধ জগতের ডন হয়ে ওঠে।
মায়া ডোলাস ছিলেন মুম্বাইয়ের অপরাধ ইতিহাসের একটি কাল্ট চরিত্র। তার উত্থান ছিল উল্কার মতো দ্রুত, আর পতন ছিল ততটাই ভয়াবহ (Maya Dolas)। তার মৃত্যু মুম্বাই পুলিশকে অপরাধ দমনে নতুন সাহস জুগিয়েছিল, অন্যদিকে দাউদ ইব্রাহিমের মতো অপরাধীদের কৌশলী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। আজও লোখান্ডওয়ালা কমপ্লেক্সের সেই দেওয়ালগুলো ১৬ নভেম্বরের সেই ভয়াবহ স্মৃতি বহন করে চলেছে।
