Wall Writing
নিবেদিতা পাঁজা, Bengal Liberty: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দেওয়াল লিখন (Wall Writing) কেবল একটি প্রচারের সরঞ্জাম নয়, এটি এই ভূখণ্ডের রাজনৈতিক বিবর্তন, সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং শৈল্পিক প্রতিবাদের এক অনন্য আখ্যান। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলার গ্রাম থেকে শহরের আনাচে-কানাচে দেওয়ালগুলো রাজনৈতিক আদর্শের ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

দেওয়ালের বয়ান: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও বিবর্তিত লিখনশৈলী (Wall Writing)
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হলো দেওয়াল লিখন। যে রাজ্যে রাজনীতি মানুষের শোওয়ার ঘর থেকে শুরু করে পাড়ার চায়ের আড্ডা পর্যন্ত বিস্তৃত, সেখানে চুনকামে ঢাকা দেওয়ালের ওপর রঙিন তুলির টান কেবল এক বিজ্ঞাপন নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশ । বাংলার রাজনীতির এই শৈল্পিক ধারাটি কয়েক দশক ধরে সমাজ ও ক্ষমতার পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ঐতিহ্য ও শৈল্পিক বিবর্তন (Wall Writing)
বাংলার দেওয়াল লিখনের এই প্রথাটি মূলত ষাটের ও সত্তরের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে দানা বাঁধতে শুরু করে । সেই সময় মুদ্রণ মাধ্যম ও বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা থাকায় রাজপথের ধারের দেওয়ালগুলোই হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা । বিশেষ করে বামপন্থী আন্দোলনের হাত ধরে এই শিল্পকলা এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় । ‘ভুষো কালি’ আর ‘শিরীষ আঠা’র মিশ্রণে তৈরি কালো রঙের প্রলেপে যখন জটিল রাজনৈতিক তত্ত্বকে সরল ছড়া বা ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা হতো, তখন তা মুহূর্তেই পথচলতি মানুষের নজর কাড়ত । সেই সময় ‘গণশক্তি‘র মতো সংবাদপত্রে নিয়মিত রাজনৈতিক ছড়া ও স্লোগান প্রকাশিত হতো যা দেওয়াল লিখনে ব্যবহৃত হতো। সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের সময়ও দেওয়াল লিখন ছিল এক শক্তিশালী প্রতিবাদের অস্ত্র। রাতের অন্ধকারে অতিবাম শক্তির স্লোগান দেওয়ালে দেওয়ালে ফুটে উঠত, যা ক্ষমতার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাত । এরপর বামফ্রন্টের দীর্ঘ ৩৩ বছরের শাসনামলে দেওয়াল লিখন একটি নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল প্রচার মাধ্যমে পরিণত হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানের পর থেকে এই শিল্পে আরও বেশি রঙ ও গ্রামীণ ছড়ার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

রাজনৈতিক রসিকতা ও শ্লেষের ভাষা (Wall Writing)
বাংলার দেওয়াল লিখনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর বুদ্ধিদীপ্ত শ্লেষ ও হাস্যরস । কেবল প্রার্থীর নাম বা প্রতীকের ছবি নয়, বিরোধীদের আক্রমণ করতেও হাস্যরসের আশ্রয় নেওয়া হতো। ‘ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল, ঘুষ নিয়েছে তৃণমূল’ বা ‘ফেরাতে হাল, ফিরছে লাল’-এর মতো ছন্দবদ্ধ স্লোগানগুলো বাংলার লোকসংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল । কার্টুন ও ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে সমসাময়িক দুর্নীতির অভিযোগ বা প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে তুলে ধরার এই প্রবণতা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য, যা ভারতের অন্য অনেক রাজ্যেই বিরল ।
আইনি কাঠামো ও নির্বাচন কমিশনের প্রভাব
দেওয়াল লিখনকে কেন্দ্র করে অনেক সময় সম্পত্তি নষ্টের অভিযোগ উঠেছে। ১৯৭৬ সালে ‘পশ্চিমবঙ্গ সম্পত্তি বিকৃতি প্রতিরোধ আইন’ (West Bengal Prevention of Defacement of Property Act) পাস হলেও দীর্ঘ সময় তা রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত ছিল । কিন্তু ২০০৬ সালের পর থেকে নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারিতে দেওয়াল লিখনের ওপর অনেক বিধিনিষেধ আরোপিত হয় । এখন বাড়ির মালিকের লিখিত অনুমতি ছাড়া দেওয়ালে রাজনৈতিক প্রচার চালানো আইনত নিষিদ্ধ । এই কড়াকড়ির ফলে যত্রতত্র দেওয়াল দখলের সংস্কৃতি কিছুটা কমলেও, রাজনীতির সেই শৈল্পিক আবেদনও কিছুটা ম্লান হয়েছে।
ডিজিটাল যুগ বনাম তুলির টান
একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এসে রাজনৈতিক প্রচারের ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। সোশ্যাল মিডিয়া, রিলস, মিম এবং ডিজিটাল ফ্লেক্সের দাপটে হাতে আঁকা দেওয়াল লিখনের চাহিদা অনেকটা কমেছে । রাজনৈতিক দলগুলো এখন কম পরিশ্রমে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে ডিজিটাল মাধ্যমকেই বেছে নিচ্ছে। এমনকি বামপন্থীরাও এখন সোশ্যাল মিডিয়া উইং তৈরি করে ডিজিটাল পোস্টারের ওপর জোর দিচ্ছে। শিল্পী অজয় দত্তর মতো অনেক দেওয়াল লিখন শিল্পী এখন কাজ হারিয়ে ডিজিটাল ব্যানারের দিকে ঝুঁকছেন, যা এই ঐতিহ্যের অবক্ষয়কেই নির্দেশ করে।

এত সব পরিবর্তনের পরেও, বাংলার মাটির সঙ্গে দেওয়াল লিখনের এক নিবিড় সম্পর্ক আজও বিদ্যমান। ফ্লেক্স বা ব্যানারের কৃত্রিম চাকচিক্যের চেয়ে দেওয়ালে হাতে আঁকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্কেচ কিংবা মোদীর অবয়ব আজও ভোটারদের মনে দ্রুত রেখাপাত করে । দেওয়াল লিখন আসলে বাংলার রাজনীতির এক ‘অ্যানালগ’ প্রাণস্পন্দন, যা ডিজিটাল যুগেও তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট। এটি কেবল একটি ভোট চাওয়ার কৌশল নয়, বরং বাংলার প্রতিটি ইটের খাঁজে লুকিয়ে থাকা এক দীর্ঘ গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ইতিহাস। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রচারের মাধ্যম বদলালেও, দেওয়ালে ফুটে ওঠা সেই রাজনৈতিক বয়ান বাংলার সংস্কৃতির এক স্থায়ী স্বাক্ষর হয়ে থাকবে।
