Virat Kohli Changes His Batting Technique
Bengal Liberty,সিদ্ধার্থ দে:
৩৭ বছরেও অদম্য কোহলি: নতুন টেকনিক ও আগ্রাসনের লড়াইয়ে ক্রিকেটের ‘কিং’(Virat Kohli)
ক্রিকেট বিশ্বে একটি কথা প্রচলিত আছে—“Age is just a number” (বয়স কেবল একটি সংখ্যা)। কিন্তু পেশাদার ক্রিকেটে, বিশেষ করে যেখানে ফিটনেস এবং রিফ্লেক্সের পরীক্ষা প্রতি মুহূর্তে দিতে হয়, সেখানে ৩৭ বছর বয়সে এসে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা চাট্টিখানি কথা নয়। বিরাট কোহলি ঠিক এই অসাধ্য সাধনটিই করে দেখাচ্ছেন। জীবনের ৩টা দশক পেরিয়ে এসেও তিনি বোলারদের চোখে চোখ রেখে কথা বলছেন, তাঁর ব্যাটের ধার বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং বেড়েছে আগ্রাসন।

ব্যাটিং টেকনিকে আমূল পরিবর্তন: সময় নেওয়ার দিন শেষ?(Virat Kohli Changes His Batting Technique)
বিরাট কোহলির(Virat Kohli)ব্যাটিংয়ের চিরাচরিত ধরন ছিল শুরুতে কিছুটা সময় নেওয়া। তিনি ক্রিজে এসে প্রথমে বলের গতি এবং পিচের চরিত্র বুঝে নিতেন। সেট হওয়ার পর তিনি তাঁর ইনিংসকে বড় করার দিকে মন দিতেন এবং শেষ দিকে ঝোড়ো গতিতে রান তুলতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও তাঁর নিজের বক্তব্য বলছে অন্য কথা।
নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম একদিনের ম্যাচে ৯৩ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলার পর কোহলি নিজেই জানিয়েছেন তাঁর এই মানসিক বদলের কথা। তিনি এখন আর ক্রিজে শুধু টিকে থাকার জন্য লড়াই করছেন না। তাঁর লক্ষ্য এখন ‘পাল্টা আক্রমণ’। কোহলির কথায়, “পরিস্থিতি কঠিন হলেও এখন আমি হাত খুলে মারার জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করছি না। প্রথম ২০টি বলের সদ্ব্যবহার করাটাই এখন আমার লক্ষ্য।” এই যে ইনিংসের শুরু থেকেই বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশল, এটিই কোহলিকে আধুনিক ক্রিকেটের আরও বিধ্বংসী এক ব্যাটারে পরিণত করেছে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় বর্তমান ফর্ম
কোহলির এই নতুন আগ্রাসী মেজাজ যে কাজ দিচ্ছে, তার প্রমাণ তাঁর পরিসংখ্যান। শেষ সাতটি একদিনের ম্যাচে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে:
* ৩টি শতরান
* ৪টি অর্ধশতরান
অর্থাৎ, প্রতিটি ম্যাচেই তিনি বড় রানের মুখ দেখছেন। এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, টেকনিক বদলালেও তাঁর রানের ক্ষিদে একবিন্দু কমেনি।

বিশেষজ্ঞদের ভিন্ন মত: অশ্বিন বনাম কাইফ(Virat Kohli)
কোহলির এই পরিবর্তনকে একেকজন বিশেষজ্ঞ একেক নজরে দেখছেন। ভারতের অভিজ্ঞ স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিন মনে করেন, কোহলির টেকনিক আসলে বদলায়নি। অশ্বিনের মতে, কোহলি এখন অনেক বেশি চাপমুক্ত। তিনি ক্রিকেটকে উপভোগ করছেন। ছোটবেলায় দিল্লির গলি ক্রিকেটে যেভাবে নির্ভীক হয়ে খেলতেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে এখন সেই মেজাজেই ধরা দিচ্ছেন বিরাট।
অন্যদিকে, মহম্মদ কাইফ বিরাটের এই শরীরী ভাষা দেখে মুগ্ধ। কাইফের মতে, কোহলির মুখে সবসময় হাসি লেগে আছে, সতীর্থদের সঙ্গে মজা করছেন, অথচ মাঠে নামলে তিনি চরম আগ্রাসী। কাইফ এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে তিনি মনে করেন, এই ফিটনেস এবং মানসিকতা বজায় থাকলে কোহলি আরও অন্তত ৫-৬ বছর অনায়াসেই দেশের হয়ে খেলতে পারবেন

বিতর্ক ও সমালোচনা: মঞ্জরেকরের ‘খোঁচা’(Expert`s Opinion About Kohli)
সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচনাও কোহলির (Virat Kohli)নিত্যসঙ্গী। ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার সঞ্জয় মঞ্জরেকর কোহলির এই সাফল্যকে কিছুটা খাটো করে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, কোহলি এখন টেস্টের মতো কঠিন ফরম্যাট ছেড়ে একদিনের ক্রিকেটের মতো তুলনামূলক সহজ ফরম্যাটে মন দিয়েছেন। মঞ্জরেকরের যুক্তি হলো, একদিনের ক্রিকেটে শুরুতে স্লিপ বা গালিতে বেশি ফিল্ডার থাকে না এবং বোলাররা উইকেট নেওয়ার চেয়ে রান আটকানোতে বেশি মনোযোগী থাকে। তাই টপ অর্ডারে রান করা বিশেষ কৃতিত্বের কিছু নয়। যদিও ক্রিকেট প্রেমীদের বড় অংশই মঞ্জরেকরের এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন।

মানসিক জোর ও ফিটনেস: অরুণ লালের পর্যবেক্ষণ(Amar Lal on Kohli)
বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার অরুণ লাল মনে করেন, এই বয়সে সাফল্যের চাবিকাঠি টেকনিকের চেয়েও বেশি মানসিকতা। তাঁর মতে, সচিন তেন্ডুলকরও ক্যারিয়ারের শেষ দিকে নিজের টেকনিক বদলেছিলেন। কোহলির ফিটনেস নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, কিন্তু ১৭ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার পর মানসিক ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক। কোহলি যদি তাঁর জয়ের খিদে এবং মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখতে পারেন, তবেই তিনি দীর্ঘস্থায়ী হবেন।

সচিনের উত্তরসূরি কি হতে পারবেন বিরাট?(Sachin And Kohli)
৩৭ বছর বয়সের পর সফল হওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সচিন তেন্ডুলকর। তিনি ৪০ বছর পর্যন্ত খেলেছেন এবং ৩৮ বছর বয়সেও টেস্টে দ্বিশতরান করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ ওয় ৩৮ বছর বয়স পর্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে খেলেছেন। কোহলি এখন সেই পথেই হাঁটছেন।

বিরাট কোহলি এখন তাঁর ক্যারিয়ারের এমন এক পর্যায়ে আছেন যেখানে তিনি নিজের জন্য নয়, বরং দলের প্রয়োজনে এবং নিজের আনন্দের জন্য খেলছেন। তাঁর এই নতুন ‘অ্যাগ্রেসিভ’ ব্যাটিং টেকনিক বোলারদের মনে নতুন করে ভীতি সঞ্চার করছে। যদি তিনি এই ফর্ম এবং ফিটনেস ধরে রাখতে পারেন, তবে ২০২৭ সালের বিশ্বকাপেও কোহলিকে ভারতীয় দলের মূল স্তম্ভ হিসেবে দেখলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
বিরাট কোহলি প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে, পরিশ্রম আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে সময়ের ঘড়িকেও থমকে দেওয়া সম্ভব। ক্রিকেট বিশ্ব এখন চাতক পাখির মতো তাকিয়ে বিরাটের পরবর্তী শতরানটির দিকে।
