Operation Wrath of God 1972
Operation Wrath of God 1972

অপারেশন রথ অব গড (Operation Wrath of God 1972): ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েলের এক আপসহীন লড়াই ও মোসাদের দুর্ধর্ষ প্রতিশোধের ইতিহাস

Bengal Liberty, সিদ্ধার্থ দে:

Operation Wrath of God (Operation Wrath of God 1972) বা “ঈশ্বরের ক্রোধ” হলো বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত, বিতর্কিত এবং দুর্ধর্ষ একটি গোপন সামরিক অভিযান। ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে ইসরায়েলি অ্যাথলেটদের ওপর ফিলিস্তিনি জঙ্গি গোষ্ঠী ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’-এর বর্বরোচিত হামলার প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এই দীর্ঘমেয়াদী অপারেশন পরিচালনা করে।

Operation Wrath of God
Operation Wrath of God

মিউনিখ ম্যাসাকার ১৯৭২ (Operation Wrath of God 1972)

১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মিউনিখ অলিম্পিক চলাকালীন ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’-এর আটজন সদস্য অলিম্পিক ভিলেজে ইসরায়েলি অ্যাথলেটদের ওপর হামলা চালায়। তারা ১১ জন ইসরায়েলি কোচ ও খেলোয়াড়কে জিম্মি (Hostage) করে এবং পরবর্তীতে অত্যন্ত নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করে। এই ঘটনা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেয়। ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার প্রতিজ্ঞা করেন যে, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত প্রত্যেককে খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া হবে।

Munich Massacre
Munich Massacre 1972

‘কমিটি এক্স’ এবং অপারেশনের অনুমোদন (Operation Wrath of God 1972)

গোল্ডা মেয়ার এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোশে দিয়ান একটি অতি গোপনীয় কমিটি গঠন করেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘কমিটি এক্স’। এই কমিটির কাজ ছিল মিউনিখ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী এবং ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের নেতাদের চিহ্নিত করে তাদের নির্মূল করার নির্দেশ দেওয়া। মোসাদ প্রধান জভি জামির-এর নেতৃত্বে এই অপারেশনের নীল নকশা (Blueprint) তৈরি হয়। অপারেশনটির কোড নেম রাখা হয় “অপারেশন বেয়নেট”, যা পরবর্তীকালে ইতিহাসে ‘অপারেশন রথ অব গড’ নামে পরিচিতি পায়।

Operation Wrath of God
Operation Wrath of God

মোসাদের হিট স্কোয়াড: সিজারিয়া ইউনিট (Operation Wrath of God 1972)

মোসাদের একটি বিশেষ শাখা ‘সিজারিয়া’ (Caesarea) এই দায়িত্ব পালন করে। অপারেশনটি পরিচালনার জন্য এজেন্টদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়েছিল:

• আলেফ (Aleph): মূল ঘাতক দল, যারা টার্গেটকে সরাসরি গুলি বা বোমা হামলা করত।
• বেত (Bet): রক্ষী দল, যারা হামলা চালানোর সময় এলাকা পাহারা দিত এবং পালানোর পথ নিশ্চিত করত।
• হেত (Het): লজিস্টিক দল, যারা এজেন্টদের জন্য ভুয়া পরিচয়পত্র, থাকার হোটেল এবং গাড়ি ভাড়ার ব্যবস্থা করত।
• আইন (Ayin): নজরদারি দল, যারা টার্গেটের দৈনন্দিন রুটিন পর্যবেক্ষণ করত।

Operation Wrath of God
Caesarea Unit

প্রধান লক্ষ্যবস্তু ও সফল অপারেশনসমূহ (Operation Wrath of God 1972)

অপারেশনটি প্রায় ২০ বছর ধরে চলেছিল। মোসাদ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে টার্গেটদের খুঁজে বের করে একের পর এক হামলা চালায়।

• ওয়ায়েল জুয়াইতার (অক্টোবর ১৯৭২): রোমে পিএলও প্রতিনিধি জুয়াইতারকে মোসাদ এজেন্টরা তার বাসার নিচে ১২টি গুলি করে হত্যা করে। ইসরায়েলের দাবি ছিল তিনি মিউনিখ হামলার সাথে জড়িত, যদিও অনেকে এটি বিতর্কিত মনে করেন।

Operation Wrath of God
Operation Wrath of God

• মাহমুদ হামশারি (ডিসেম্বর ১৯৭২): প্যারিসে তার টেলিফোনের নিচে বিস্ফোরক রাখা হয়। ফোনে কথা বলার সময় রিমোটের সাহায্যে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাকে গুরুতর আহত করা হয় এবং পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

• অপারেশন স্প্রিং অব ইয়ুথ (১৯৭৩): এটি ছিল সবচেয়ে দুর্ধর্ষ আক্রমণ। বৈরুতে কমান্ডো দল পাঠিয়ে পিএলও-র তিন উচ্চপদস্থ নেতাকে (আবু ইউসুফ, কামাল আদওয়ান এবং কামাল নাসের) তাদের নিজেদের ঘরে হত্যা করা হয়। এই অভিযানে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক একজন নারীর ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন।

লিলেহ্যামার বিপর্যয় ১৯৭৩ (Operation Wrath of God 1972)

অপারেশনের একটি কালো অধ্যায় হলো নরওয়ের লিলেহ্যামার শহর। মোসাদ ভুলবশত আলি হাসান সালামেহ (যিনি রেড প্রিন্স নামে পরিচিত ছিলেন) মনে করে আহমেদ বুচিকি নামক একজন সাধারণ মরক্কান ওয়েটারকে হত্যা করে। এই ভুলের কারণে মোসাদের বেশ কয়েকজন এজেন্ট নরওয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে এবং ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। এরপর অপারেশনটি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।

Lillehammer 1973
Lillehammer 1973

 

আলি হাসান সালামেহ-র মৃত্যু ১৯৭৯ (Operation Wrath of God 1972)

১৯৭৯ সালে মোসাদ অবশেষে তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু আলি হাসান সালামেহ-কে লেবাননের বৈরুতে খুঁজে পায়। তার গাড়ির পাশে একটি রিমোট কন্ট্রোল বোমা ব্যবহার করে তাকে হত্যা করা হয়। সালামেহ ছিলেন মিউনিখ হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী।

Ali Hassan Salameh's Death
Ali Hassan Salameh’s Death

অপারেশনের ফলাফল ও বিতর্ক (Operation Wrath of God 1972)

অপারেশন রথ অব গড’-এর সাফল্য নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে।

• সাফল্য: ইসরায়েল প্রমাণ করতে পেরেছিল যে, পৃথিবীর যেখানেই তাদের নাগরিকদের ক্ষতি করা হোক না কেন, মোসাদ তাদের খুঁজে বের করবেই। এটি ভবিষ্যতে অনেক সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি ‘ডিটারেন্ট’ হিসেবে কাজ করেছে।
• বিতর্ক: অনেক সমালোচক মনে করেন, মোসাদ যাদের হত্যা করেছে তাদের সবাই সরাসরি মিউনিখ হামলার সাথে যুক্ত ছিলেন না। অনেকে কেবল ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা লেখক ছিলেন। এছাড়া লিলেহ্যামারের মতো ঘটনায় নির্দোষ মানুষ হত্যার অভিযোগও রয়েছে।

অপারেশন রথ অব গড কেবল একটি প্রতিশোধমূলক অভিযান ছিল না; এটি ছিল ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতির একটি অংশ। আধুনিক স্পাই থ্রিলার সিনেমা বা উপন্যাসের চাইতেও রোমাঞ্চকর এবং রক্তক্ষয়ী এই অপারেশনটি আজও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ইতিহাসে একটি রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে। স্টিভেন স্পিলবার্গের বিখ্যাত সিনেমা ‘Munich’ এই অপারেশনের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:

ভারতের অজেয় রক্ষাকবচ (The Terrible Story of Ajit Doval): আধুনিক চাণক্য অজিত ডোভালের মাস্টারমাইন্ড রণকৌশল ও এক রোমহর্ষক জীবনগাথা

 

 

Bengal liberty
Bengal liberty

Bengal Liberty is a platform dedicated to guerrilla, unfiltered, and independent journalism. Through YouTube, its official website, and various social media channels, Bengal Liberty seeks to present citizen journalism to the public with integrity and transparency. Editor: Bittu Roy Chowdhury