Bengal Liberty : “এত চোখের জল কোনও পুজোয় পড়েনি।” বিজয়া দশমীর পর এমনই মন্তব্য করলেন কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনও হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। চারবারের বিধায়ক হয়েও নিজের কেন্দ্রের মানুষের কাছে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাতে যেতে পারেননি, এই আক্ষেপই যেন তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাঁকে। আর সেই আক্ষেপ থেকেই কি রাজনীতির প্রতি মোহভঙ্গ? রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে একের পর এক তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন তৃণমূলের এই নেতা। তাঁর কথায়, “আমি রাজনীতিকে ঘৃণা করি। আই হেট পলিটিক্স। এবং সেই রাজনীতির এক অংশ হিসেবে আমি নিজেকেও ঘৃণা করি।”
একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত ছিলেন মদন মিত্র। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। বর্তমানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন মদন মিত্র। রাজ্যের একটি প্রথম সারির বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক জল্পনা তুঙ্গে। কিন্তু এ বারের পুজোয় ঠিক কী এমন ঘটল, যার জেরে রাজনীতি নিয়েই এতটা হতাশার কথা শোনা গেল তাঁর মুখে?
মদনের দাবি, পুজোর সময় কলকাতার কয়েকটি বড় মণ্ডপে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলেও নিজের বিধানসভা কেন্দ্রের মানুষের কাছে পৌঁছতে পারেননি তিনি। তাঁর অভিযোগ, এলাকায় আতঙ্ক, সন্ত্রাস ও নিরাপত্তার অভাবের কারণে সেখানে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এমনকী, অস্ত্র নিয়ে দুষ্কৃতীদের ঘোরাফেরার অভিযোগও করেছেন তিনি।
আরও খবর
নিজের আক্ষেপের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন কামারহাটির বিধায়ক। তাঁর কথায়, “আমায় যারা জিতিয়েছে, আমি তাদের কাছে যেতে পারলাম না।” মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে না পারার যন্ত্রণা তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে বলেও জানান তিনি। মদনের অভিযোগ, এলাকার বহু মানুষ সমস্যায় পড়লেও তাঁদের কাছে পৌঁছতে পারছেন না তিনি। আর সেই কারণেই রাজনীতিতে থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে তাঁর নিজের মনেই।
রাজনীতি ছাড়ার প্রসঙ্গে মদন বলেন, “আমি চেষ্টা করব এমন কিছু না করার, যাতে মানুষ কষ্ট পায়। তার জন্য একমাত্র পথ হচ্ছে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া।” তবে ভবিষ্যতে তিনি পুরোপুরি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াবেন কি না, তা স্পষ্ট করেননি। বরং জানিয়েছেন, তিনি নিজেই এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তাঁর কথায়, “আমি কনফিউজড। আই অ্যাম টায়ার্ড, টু টায়ার্ড টু ডু পলিটিক্স।”
রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন মদন মিত্র। মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তাঁর বক্তব্য, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও সেই ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের কাছে পৌঁছনোর দায়িত্বও জড়িয়ে রয়েছে। তাঁর কথায়, “আপনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে একজন বিধায়ক।” নিজের কেন্দ্রে যেতে না পারার আক্ষেপ থেকেই এই মন্তব্য করেছেন তিনি।
একইসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী—দু’জনের প্রতিই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা জানিয়েছেন বর্ষীয়ান নেতা। অহঙ্কারে মত্ত হয়ে মানুষের কথা ভুলে না যাওয়ার বার্তাও দিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝেও মানুষের প্রয়োজনে পাশে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন কামারহাটির বিধায়ক।
মদন মিত্রের কথায়, “এখন মনে হচ্ছে ধর্মের নামে অধর্ম করছি।” তাঁর এই উপলব্ধির নেপথ্যে আসল কারণ কী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক মহলে। তবে তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর রাজনীতির প্রতি বিতৃষ্ণার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করা। রাজনীতির মাধ্যমেই একসময় পরিচিতি পেয়েছিলেন মদন মিত্র। সেই রাজনীতি থেকেই কি এ বার সত্যিই সরে দাঁড়াবেন তিনি? বিজয়ার আবেগঘন সাক্ষাৎকারের পর সেই প্রশ্নই এখন সামনে।


