Dark Story of Uzair Baloch
Bengal Liberty, সিদ্ধার্থ দে:
উজাইর বালোচ(Dark Story of Uzair Baloch): লিয়ারির ত্রাস ও রাজনীতির কালো অধ্যায়
উজাইর জান বালোচ—করাচির লিয়ারি এলাকার একসময়ের “বেতাজ বাদশা”। তাকে কেউ বলত রবিনহুড, কেউ বা বলত সাক্ষাৎ যমদূত। তার জীবন এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ: রাজনীতি, গ্যাংস্টার কালচার এবং চরম নৃশংসতা।

সাধারণ শুরু থেকে ডন হয়ে ওঠা (Dark Story of Uzair Baloch)
উজাইর জান বালোচ কোনো জন্মগত অপরাধী ছিল না। তার বাবা ফয়জল বালোচ ছিলেন করাচির একজন সাধারণ ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী। উজাইরের শৈশব কেটেছে লিয়ারির সরু গলিতে। পড়াশোনা খুব বেশি না করলেও সে এলাকায় বেশ পরিচিত ছিল।
টার্নিং পয়েন্ট আসে ২০০৩ সালে। উজাইরের বাবাকে অপহরণ করে হত্যা করে তৎকালীন কুখ্যাত গ্যাংস্টার আরশাদ পাপ্পু। এই একটি ঘটনাই উজাইরের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বাবার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার আগুন তাকে অন্ধকার জগতের পথে ঠেলে দেয়।

রেহমান ডাকাতের ছত্রছায়ায়
বাবার মৃত্যুর পর উজাইর হাত মেলায় আব্দুল রেহমান বালোচ ওরফে রেহমান ডাকাত-এর সাথে। রেহমান ছিল আরশাদ পাপ্পুর চিরশত্রু। রেহমানের অধীনেই উজাইর অপরাধ জগতের দীক্ষা নেয়। ধীরে ধীরে সে লিয়ারির গ্যাং ওয়ারের ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা হয়ে ওঠে।
২০০৯ সালে পুলিশের এনকাউন্টারে রেহমান ডাকাত মারা গেলে লিয়ারির গ্যাংস্টার সাম্রাজ্যের দায়িত্ব আসে উজাইরের কাঁধে। সে গঠন করে “পিপলস আমান কমিটি” (PAC)। কাগজে-কলমে এটি একটি সামাজিক সংগঠন হলেও বাস্তবে এটি ছিল উজাইরের নিজস্ব প্রাইভেট আর্মি।
রাজনীতি ও ক্ষমতার দাপট
উজাইর বালোচ খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিল যে শুধু বন্দুক দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়, দরকার রাজনৈতিক আশ্রয়। সেই সময় পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দল পিপলস পার্টি (PPP)-এর সাথে তার গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে।
পিপলস পার্টির হয়ে লিয়ারির ভোট ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করত উজাইর। বিনিময়ে পুলিশ ও প্রশাসনকে তার ইশারায় চলতে হতো। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার মির্জা প্রকাশ্যে উজাইরকে নিজের ভাই হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এই রাজনৈতিক মদত উজাইরকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যায়।
নৃশংসতার চূড়ান্ত সীমা: আরশাদ পাপ্পু হত্যাকাণ্ড (Dark Story of Uzair Baloch)
উজাইর বালোচের নৃশংসতার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর উদাহরণ হলো ২০১৩ সালের আরশাদ পাপ্পু হত্যাকাণ্ড। এটি শুধু একটি খুন ছিল না, এটি ছিল চরম পাশবিকতার প্রদর্শনী।
বাবার হত্যার বদলা
২০১৩ সালের মার্চ মাসে উজাইরের লোকেরা আরশাদ পাপ্পু, তার ভাই ইয়াসির আরাফাত এবং তাদের এক সহযোগীকে অপহরণ করে। তাদের নিয়ে আসা হয় লিয়ারির ডেরায়। উজাইরের চোখে তখন ১০ বছর আগের বাবার লাশের ছবি ভাসছিল।
সেই বীভৎস রাত

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও পরবর্তী তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী:
• আরশাদ পাপ্পু এবং তার সঙ্গীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমানবিক নির্যাতন করা হয়।
• তাদের শরীরের চামড়া তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং চোখে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল।
• সবচেয়ে শিউরে ওঠা তথ্য হলো, আরশাদ পাপ্পুর মাথা কেটে আলাদা করে ফেলা হয়।
কাটা মাথা নিয়ে ফুটবল খেলা
উজাইর এবং তার সহযোগীরা আরশাদ পাপ্পুর কাটা মাথা নিয়ে লিয়ারির রাস্তায় ফুটবল খেলেছিল। এই বীভৎস দৃশ্য তারা ভিডিও করে ছড়িয়ে দেয় যাতে পুরো করাচিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর দেহগুলো টুকরো টুকরো করে ড্রামে ভরে অ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে নর্দমায় ফেলে দেওয়া হয়। এটি ছিল করাচির অপরাধ জগতের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস প্রতিশোধ।
গ্যাং ওয়ার ও হাজারো মানুষের রক্ত (Dark Story of Uzair Baloch)
উজাইর বালোচের নির্দেশে করাচিতে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তার “ডেথ স্কোয়াড” শহরের ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সাধারণ মানুষকেও রেহাই দেয়নি।
• ভাতা আদায় (Extortion): করাচির ব্যবসায়ীরা উজাইরের নাম শুনলেই ভয়ে কাঁপত। চাঁদা না দিলে লাশ পড়ত বাজারের মাঝখানে।
• গুপ্তচরবৃত্তি ও দেশদ্রোহিতা: উজাইরের বিরুদ্ধে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার অভিযোগও ছিল।
• পুলিশ হত্যা: ২০১২ সালে যখন পুলিশ লিয়ারিতে অপারেশন করতে যায়, উজাইরের গ্যাং টানা আট দিন পুলিশের সাথে যুদ্ধ করে এবং অনেক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে।

পতনের শুরু ও বর্তমান অবস্থা
২০১৩ সালের পর যখন করাচিতে রেঞ্জার্স অপারেশন শুরু হয়, তখন উজাইর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। কয়েক বছর পলাতক থাকার পর ২০১৬ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে সে পাকিস্তানের জেলে বন্দী এবং তার বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও দেশদ্রোহিতার ডজন ডজন মামলা চলছে।
লিয়ারির সেই “রবিনহুড” আজ একজন দণ্ডিত অপরাধী, যার নামের সাথে জড়িয়ে আছে রক্ত আর নৃশংসতার ইতিহাস।
গ্রেফতার ও মুক্তির লুকোচুরি: আইনের জালে ‘লাকি’ উজাইর (Dark Story of Uzair Baloch)
উজাইর বালোচ শুধু একজন গ্যাংস্টার ছিল না, সে ছিল রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা এক অপরাজেয় শক্তি। তার গ্রেফতারির ইতিহাস মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বিভক্ত:
২০০৬ সালের প্রথম বড় গ্রেফতার
উজাইর যখন প্রথমবার বড় মাপের আলোচনায় আসে, তখন সিন্ধু প্রদেশের পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। সেই সময় তার বিরুদ্ধে খুন এবং চাঁদাবাজির বেশ কিছু মামলা ছিল। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং লিয়ারির ভোট ব্যাংক হাতে রাখার জন্য প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়েন। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। এটিই ছিল তার অপরাধ জগতে আরও বেপরোয়া হওয়ার শুরু।

২০১২ সালের ইন্টারপোল রেড ওয়ারেন্ট
২০১২ সালে করাচিতে পরিস্থিতির চরম অবনতি হলে পাকিস্তান সরকার উজাইরের মাথার দাম ২ কোটি টাকা (PKR) ঘোষণা করে। তার বিরুদ্ধে রেড ওয়ারেন্ট জারি করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে সে দুবাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ধারণা করা হয়, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারাই তাকে দেশ ছাড়তে সাহায্য করেছিলেন।
২০১৪: দুবাই এয়ারপোর্টে আটক
২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ওমানের মাস্কাট থেকে দুবাই ঢোকার সময় ইন্টারপোলের হাতে উজাইর বালোচ ধরা পড়ে। পাকিস্তান সরকার তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘ আইনি লড়াই চালায়। প্রায় এক বছর দুবাইয়ের জেলে থাকার পর, তাকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনা হয়।
২০১৬: চূড়ান্ত গ্রেফতার ও রেঞ্জার্স হেফাজত
২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি করাচির উপকণ্ঠে একটি তল্লাশিতে পাকিস্তানি রেঞ্জার্স আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে তারা উজাইর বালোচকে গ্রেফতার করেছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তাকে আসলে অনেক আগেই গোপনে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল এবং দীর্ঘ জেরার পর গ্রেফতারি দেখানো হয়।
বর্তমান অবস্থা (Dark Story of Uzair Baloch):
বর্তমানে উজাইর বালোচ পাকিস্তানের সেন্ট্রাল জেলে বন্দী। সামরিক আদালত (Military Court) তাকে দেশদ্রোহিতা এবং ইরানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে কয়েক ডজন হত্যা মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র: উজাইর বালোচ ও ‘র’ (RAW)-এর যোগসূত্র (Dark Story of Uzair Baloch)
উজাইর বালোচের অপরাধের তালিকা শুধু করাচির গলি বা গ্যাং ওয়ারে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০১৬ সালে যখন পাকিস্তানি রেঞ্জার্স তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করে, তখন তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে মারাত্মক যে অভিযোগটি আনা হয়, তা হলো দেশদ্রোহিতা এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা।

গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ ও ডিরেক্ট কানেকশন
পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ইন্টারোগেশন রিপোর্টে দাবি করা হয় যে, উজাইর বালোচ ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (Research and Analysis Wing – RAW) এবং ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখত। অভিযোগ ওঠে যে, সে করাচির করাচি পোর্ট ট্রাস্ট (KPT) এবং পাকিস্তান নেভির কৌশলগত অবস্থানের তথ্য পাচার করত।
কেন এই ‘ইন্ডিয়ান এজেন্ট’ তকমা? (Dark Story of Uzair Baloch)
তদন্তকারীদের মতে, উজাইর বালোচকে ব্যবহার করে করাচির ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা ছিল বিদেশি সংস্থাগুলোর লক্ষ্য। করাচি যেহেতু পাকিস্তানের অর্থনৈতিক রাজধানী, তাই লিয়ারির গ্যাংস্টারদের মাধ্যমে সেখানে দাঙ্গা এবং অরাজকতা জিইয়ে রাখা সহজ ছিল।

• পাসপোর্ট বিতর্ক: উজাইর বালোচ একাধিক পরিচয়পত্র এবং ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করত। জানা যায়, সে দীর্ঘ সময় ওমান এবং দুবাইয়ে থাকার সময় এই বিদেশি হ্যান্ডলারদের মাধ্যমে সুরক্ষিত ছিল।
• সামরিক তথ্য পাচার: তার বিরুদ্ধে করাচির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ইন্সটলেশনের ম্যাপ এবং ছবি পাচারের অভিযোগ আনা হয়, যা সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ছিল।
সামরিক আদালতে বিচার (Military Court Verdict)
২০২০ সালে পাকিস্তানের একটি সামরিক আদালত উজাইর বালোচকে ‘Official Secrets Act’ বা সরকারি গোপনীয়তা আইনের অধীনে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেয়। এই সাজাটি শুধুমাত্র তার গ্যাং ওয়ার বা খুনের জন্য ছিল না, বরং এটি ছিল তার দেশদ্রোহিতা এবং বিদেশি শক্তির (বিশেষ করে ‘র’) সাথে যোগসূত্রের আইনি স্বীকৃতি।
➡️ https://t.co/s4zza2Qcwa বিস্তারিত পড়ুন লিংকে ক্লিক করে
ন্যায়ের চূড়ান্ত আঘাত(Mystery of Deadly Dawood Ibrahim): দাউদ ইব্রাহিমের রক্তক্ষয়ী সাম্রাজ্যের উত্থান ও করাচির অন্ধকার অধ্যায়@bengalliberty #bengalliberty #dawoodibrahim #indianraw #indianintelligence pic.twitter.com/GVyPDBOJX4— Bengal Liberty (@bengalliberty1) March 23, 2026
রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা বিতর্ক (Dark Story of Uzair Baloch)
যদিও উজাইর বালোচ এবং তার সমর্থকরা সবসময় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, কিন্তু পাকিস্তানি মিডিয়া এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাকে “দেশের শত্রু” হিসেবে চিত্রিত করতে এই ‘ইন্ডিয়ান এজেন্ট’ তকমাটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। এটি তার ইমেজে এক নতুন মাত্রা যোগ করে—যেখানে সে কেবল একজন গ্যাংস্টার নয়, বরং একজন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়।
আরও পড়ুন :
ন্যায়ের চূড়ান্ত আঘাত(Mystery of Deadly Dawood Ibrahim): দাউদ ইব্রাহিমের রক্তক্ষয়ী সাম্রাজ্যের উত্থান ও করাচির অন্ধকার অধ্যায়
