15 years of Revolution
15 years of Revolution

পরিবর্তনের ১৫ বছর(15 years of Revolution): খতিয়ানের দর্পণে প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ও বাস্তবের ক্ষত

Bengal Liberty, Nivedita Panja, Kolkata:

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে(15 years of Revolution) ২০১১ সালের ২০ মে ছিল এক যুগান্তকারী দিন। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ‘পরিবর্তন’-এর ডাক দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নতুন সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার পারদ ছিল গগণচুম্বী। গত ১৫ বছরে বাংলার গঙ্গায় অনেক জল বয়ে গিয়েছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা সেই শাসনের ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করি, তখন উন্নয়নের গালভরা আশ্বাসের আড়ালে রাজ্যের এক রুগ্ন ও শোচনীয় চেহারা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই দেড় দশকে উন্নয়নের যে জোয়ারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার কতটা বাস্তব রূপ পেয়েছে আর কতটা কেবল প্রচারের আড়ালে রয়ে গিয়েছে— তা আজ খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। গত দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গ কি আক্ষরিক অর্থেই এগিয়েছে, নাকি এক গভীর সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত হয়েছে—সেই প্রশ্ন আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের মনে।

15 years of Revolution
15 years of Revolution

 

শিল্পের মরুভূমি ও কর্মসংস্থানের হাহাকার(15 years of Revolution)

তৃণমূল জমানার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবত শিল্পায়নে। সিঙ্গুর আন্দোলনের হাত ধরে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শিল্পায়ন। কিন্তু গত ১৫ বছরে রাজ্যে বড় কোনো ভারী শিল্প গড়ে ওঠেনি।

শিল্পের বিকেন্দ্রীকরণে ব্যর্থতা

টাটাদের বিদায়ের পর রাজ্যে বড় মাপের লগ্নির খরা চলছে। টাটাদের বিদায়ের পর থেকে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা আজও কাটেনি। প্রতি বছর ‘বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট’ (BGBS) আয়োজিত হলেও, বাস্তবে কত হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন এবং সাধারণ মানুষের সংশয় রয়েই গেছে।

15 years of Revolution
15 years of Revolution

 

মেধাশক্তি ও পরিযায়ী শ্রমিক(15 years of Revolution):

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের দোহাই দিয়ে কর্মসংস্থানের যে খতিয়ান দেওয়া হয়, তা শিক্ষিত যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ। ফলে মেধা পাচার বা ‘ব্রেন ড্রেন’ পশ্চিমবঙ্গের জন্য এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যে কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষিত যুবক-যুবতী ভিন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন। এমনকি অদক্ষ শ্রমিকদেরও কাজের সন্ধানে কেরালা, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, দিল্লি, বিহার যেতে হচ্ছে। বাংলার ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ সমস্যা গত কয়েক বছরে এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

15 years of Revolution
15 years of Revolution

 

দুর্নীতির মাকড়সার জাল(15 years of Revolution)

গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গ এক নজিরবিহীন দুর্নীতির সাক্ষী হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে রেশন দুর্নীতি, গরু পাচার এবং কয়লা পাচার কাণ্ড—তৃণমূল শাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির মাকড়সার জাল বিস্তার করেছে। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রভাবশালী নেতাদের জেল হেফাজত প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের প্রাপ্য অধিকার কীভাবে লুট করা হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়োগের জালিয়াতি রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যোগ্য প্রার্থীরা যখন রাজপথে বছরের পর বছর ধর্ণা দিচ্ছেন, তখন অযোগ্যদের টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়া এক নৈতিক অবক্ষয়ের চরম নিদর্শন।

Scammers Of West Bengal
Scammers Of West Bengal

 

আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও রাজনৈতিক হিংসা

পরিবর্তনের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ভয়মুক্ত’ ও ‘শান্তিপূর্ণ’ বাংলা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘হিংসা’ এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গত দেড় দশকে পঞ্চায়েত বা বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে রাজনৈতিক হিংসার ছবিটা বিশেষ বদলায়নি। পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে শুরু করে বিধানসভা নির্বাচন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রক্তপাত এবং প্রাণহানি এক স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা এবং শাসকদলের ছত্রছায়ায় থাকা দুষ্কৃতীদের বাড়বাড়ন্ত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন কম নয়। কামদুনি, সন্দেশখালি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক আরজি কর কাণ্ড—রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার কঙ্কালসার চেহারা বারবার জনসমক্ষে চলে এসেছে। প্রশাসনের দলীয়করণ পুলিশ বাহিনীকে কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করেছে। তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ এবং আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ উন্নয়নের পথে এক বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তৃণমূল স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ এবং কাটমানি সংস্কৃতির বিস্তার সরকারের জনহিতকর কাজগুলোর সুফলকে অনেক ক্ষেত্রে ম্লান করে দিয়েছে।

“উন্নয়ন কেবল সংখ্যাতত্ত্বের খতিয়ান নয়, উন্নয়ন হলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা।”

Maldah Murshidabad Violence
Maldah Murshidabad Violence

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল দশা(15 years of Revolution)

একদা ভারতের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গ আজ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে ধুঁকছে। সরকারি স্কুলগুলোতে ছাত্র সংখ্যা কমছে, শিক্ষক নিয়োগ নেই। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি গত কয়েক বছরে বাংলার রাজনীতির সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেধা তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও যোগ্য প্রার্থীদের রাস্তায় বসে আন্দোলন করতে দেখা যাচ্ছে, যা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির মুখে এক বড় চপেটাঘাত।

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবি করা হলেও গ্রামীণ এলাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত করুণ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে দালাল রাজ এবং রেফার রোগ এক দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। সাধারণ মানুষের জন্য আধুনিক চিকিৎসার অভাব এবং বেসরকারি হাসপাতালের গলাকাটা খরচ মধ্যবিত্তের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে জেলা হাসপাতাল ও সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালগুলোর সংখ্যা বাড়লেও, পরিষেবার মান নিয়ে অভিযোগ কম নয়। বিশেষ করে আরজি কর কাণ্ডের মতো সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সরকারি হাসপাতালের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

Teacher's Protest
Teacher’s Protest

ঋণের বোঝা ও খয়রাতির রাজনীতি(15 years of Revolution)

রাজ্যের কোষাগার আজ শূন্যপ্রায়। অথচ সরকার জনমোহিনী প্রকল্পের নামে ‘খয়রাতির রাজনীতি’ চালিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প মানুষের সাময়িক সুরাহা দিলেও, দীর্ঘমেয়াদী পরিকাঠামো উন্নয়নে কোনো ছাপ ফেলতে পারছে না। এই প্রকল্পগুলো চালানোর জন্য সরকারকে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে। আজ পশ্চিমবঙ্গের মাথাপিছু ঋণের বোঝা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে রাজ্যের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি দেউলিয়া হওয়ার পথে। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না করে শুধুমাত্র ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখার জন্য এই ধরণের বণ্টনমূলক নীতি রাজ্যের অর্থনৈতিক ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে।

 

15 years of Revolution
15 years of Revolution

 

১৫ বছর একটি দীর্ঘ সময়। এই সময়ের মধ্যে একটি ধ্বংসপ্রায় রাজ্যকে নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকাল পর্যালোচনার শেষে দেখা যায়, প্রচারের জাঁকজমক যতটা ছিল, কাজের কাজ ততটা হয়নি। গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলো আজ নড়বড়ে। পশ্চিমবঙ্গ আজ শিল্পহীন, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ঋণজর্জর এক রাজ্যে পরিণত হয়েছে। উন্নয়নের যে ‘নীল-সাদা’ প্রলেপ দেওয়া হয়েছে, তার নিচে চাপা পড়ে গেছে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
বাংলার গত দেড় দশকের খতিয়ান মেলালে দেখা যায় এক মিশ্র ছবি। একদিকে যেমন কন্যাশ্রী বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো জনমুখী প্রকল্প মানুষের হাতে সরাসরি টাকা পৌঁছে দিচ্ছে, অন্যদিকে শিল্পের অভাব এবং নিয়োগ দুর্নীতির মতো ঘটনা রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন:

“বাংলার দেড় দশক: জনমোহিনী প্রকল্পের জোয়ার বনাম শিল্প-শূন্যতার হাহাকার”

“লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে কর্মসংস্থানের খরা: বাংলার ১৫ বছরের চড়াই-উতরাই”

 

বাংলার মানুষ কেবল ‘অনুদান’ চায় না, তারা চায় ‘অধিকার’ এবং ‘সম্মানজনক জীবিকা’। আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অগ্রগণ্য রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে কেবল ভোটের রাজনীতির কথা ভাবলে চলবে না। দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলে শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং মেধার মূল্যায়ন করাই হবে বর্তমান প্রশাসনের সামনে আসল অগ্নিপরীক্ষা।

২০২৬-এর এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলার মানুষ কি কেবল এই শোচনীয় অবস্থাকেই ভবিতব্য বলে মেনে নেবে, নাকি নতুন কোনো দিশার সন্ধান করবে, সেটাই এখন দেখার।

Bengal liberty
Bengal liberty

Bengal Liberty is a platform dedicated to guerrilla, unfiltered, and independent journalism. Through YouTube, its official website, and various social media channels, Bengal Liberty seeks to present citizen journalism to the public with integrity and transparency. Editor: Bittu Roy Chowdhury