Netaji on Swami Ji
Bengal Liberty, নিবেদিতা পাঁজা:
বিপ্লবী চেতনার সাথে আধ্যাত্মিকতার যে মেলবন্ধন আধুনিক ভারতের ইতিহাসে দেখা যায়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দুইজন মহামানব—স্বামী বিবেকানন্দ এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু (Netaji on Swami Ji)। নেতাজীর সমগ্র জীবন, রাজনীতি এবং সংগ্রামের ভিত্তিভূমি ছিল স্বামীজীর আদর্শ। স্বামী বিবেকানন্দের জন্মের শতবর্ষ পেরিয়েও নেতাজীর জবানিতে তাঁর মূল্যায়ন আজও প্রাসঙ্গিক।
আধ্যাত্মিক পিতা ও জীবনের দিশারী(Netaji on Swami Ji)
সুভাষচন্দ্র বসু বিবেকানন্দকে(Netaji on Swami Ji) আধুনিক ভারতের ‘আধ্যাত্মিক পিতা’ (Spiritual Father) হিসেবে গণ্য করতেন। কৈশোরেই সুভাষচন্দ্র স্বামীজীর রচনাবলীর সংস্পর্শে আসেন। তিনি তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (An Indian Pilgrim)-তে লিখেছেন যে, বিবেকানন্দের বাণী পড়ার পর তাঁর জীবনের লক্ষ্য আমূল বদলে গিয়েছিল। যেখানে তৎকালীন যুবসমাজ পাশ্চাত্য শিক্ষায় অন্ধ ছিল, সেখানে বিবেকানন্দ সুভাষকে শিখিয়েছিলেন আত্মমর্যাদা এবং স্বদেশপ্রেমের পাঠ।
মানুষ গড়ার কারিগর: “ম্যান মেকিং রিলিজিয়ন”
নেতাজীর চোখে বিবেকানন্দ কোনো নিছক ধর্মপ্রচারক ছিলেন না; তিনি ছিলেন ‘মানুষ গড়ার কারিগর’। বিবেকানন্দের ‘বীরবাণী’ সুভাষচন্দ্রের মনে সাহসের সঞ্চার করেছিল। নেতাজী বিশ্বাস করতেন, ভারত যদি স্বাধীন হতে চায়, তবে প্রথমে ভারতবাসীকে মানসিকভাবে বলীয়ান হতে হবে। স্বামীজীর সেই বিখ্যাত আহ্বান— “ভুলিও না তুমি জন্ম হইতেই মায়ের জন্য বলিপ্রদত্ত”— নেতাজীকে আই.সি.এস (ICS) এর লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দেশসেবায় ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলন(Netaji on Swami Ji)
নেতাজী লক্ষ্য করেছিলেন যে, বিবেকানন্দই প্রথম ভারতীয় যিনি প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতা এবং পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। শিকাগো ধর্মমহাসভায় স্বামীজীর জয়গানকে নেতাজী ভারতীয় সংস্কৃতির বিশ্বজয়ের সূচনা হিসেবে দেখতেন। নেতাজীর সামরিক সুশৃঙ্খলতা এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের সাংগঠনিক কাঠামোর পেছনে স্বামীজীর সেই কর্মযোগের আদর্শ সক্রিয় ছিল, যা অলসতা ত্যাগ করে কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ার শিক্ষা দেয়।
দরিদ্র ও আর্তের সেবা: ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’
বিবেকানন্দের ‘দরিদ্রনারায়ণ’ সেবা নীতি সুভাষচন্দ্রকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। নেতাজীর সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার মূলে ছিল স্বামীজীর সাম্যবাদ। স্বামীজী বলতেন, “মুচি মেথর তোমার ভাই”— এই ভ্রাতৃত্ববোধই নেতাজীকে আজাদী ফৌজে হিন্দু-মুসলিম-শিখ-খ্রিস্টান সবাইকে এক ছাতার তলায় আনতে সাহায্য করেছিল। নেতাজী মনে করতেন, বিবেকানন্দ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে তিনি হতেন ভারতের বিপ্লবীদের সর্বাধিনায়ক।
জাতীয়তাবাদের ধ্রুবতারা(Netaji on Swami Ji)
নেতাজী বারবার বলতেন যে, বিবেকানন্দের আদর্শ অনুসরণ না করলে ভারতের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। তাঁর কাছে স্বামীজী ছিলেন জাতীয়তাবাদের পরম উৎস। বিবেকানন্দ যেমন ভারতের অতীত ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছিলেন, তেমনি আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার শক্তি দিয়েছিলেন। নেতাজীর চোখে স্বামীজী ছিলেন একাধারে বিদ্রোহী এবং ঋষি।

কর্মযোগ: নিষ্কাম কর্ম ও সুভাষচন্দ্র
স্বামী বিবেকানন্দের ‘কর্মযোগ’ দর্শনের মূল কথা ছিল—ফলাফলের আশা না করে কর্তব্যের খাতিরে কাজ করা। নেতাজী তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এই আদর্শকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন।
ত্যাগ ও বৈরাগ্য
স্বামীজী বলতেন, “আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ” (নিজের মুক্তির জন্য এবং জগতের হিতের জন্য)। নেতাজী বিশ্বাস করতেন, দেশের মুক্তিই তাঁর ব্যক্তিগত মুক্তি। তাই তিনি আই.সি.এস-এর নিশ্চিত সুখের জীবন ত্যাগ করতে দ্বিধা করেননি।
ভয়হীনতা
কর্মযোগের অন্যতম শিক্ষা হলো অভীঃ বা ভয়হীনতা। নেতাজী যখন সাবমেরিনে করে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে পাড়ি দিচ্ছেন, তখন তাঁর সম্বল ছিল বিবেকানন্দের সেই বাণী— “বীরভোগ্যা বসুন্ধরা”।
আই.এন.এ (INA) গঠনে স্বামীজীর বাণীর ভূমিকা
আজাদ হিন্দ ফৌজ বা আই.এন.এ ছিল নেতাজীর দীর্ঘদিনের লালিত একটি স্বপ্ন, যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল বিবেকানন্দের ‘ক্ষত্রিয় বীর্য’ ও ‘ব্রহ্মতেজ’-এর আহ্বানের ওপর।

জাতীয় চরিত্রের গঠন
স্বামীজী আক্ষেপ করতেন যে ভারতীয়দের মধ্যে ‘অর্গানাইজিং পাওয়ার’ বা সংগঠন শক্তির অভাব রয়েছে। নেতাজী আই.এন.এ গঠনের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন যে, সঠিক আদর্শ থাকলে ভারতীয়রা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুশৃঙ্খল বাহিনী তৈরি করতে পারে।
ধর্মীয় উগ্রতা মুক্ত জাতীয়তাবাদ
স্বামীজী বলতেন, “ভারতবাসী আমার ভাই”। নেতাজী আই.এন.এ-র ভেতরে ধর্মীয় বিভেদ মুছে ফেলেছিলেন। স্বামীজীর ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ নীতিকে তিনি আই.এন.এ-র রান্নাঘর থেকে রণক্ষেত্র—সর্বত্র প্রয়োগ করেছিলেন।
নারীশক্তির জাগরণ
বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন, নারীদের উন্নতি ছাড়া দেশের উন্নতি অসম্ভব। তাঁর এই আদর্শ থেকেই নেতাজী গড়ে তুলেছিলেন ‘ঝাঁসির রানি বাহিনী’। এটি ছিল এশিয়ার প্রথম নারী সামরিক বাহিনী, যার অনুপ্রেরণা ছিল স্বামীজীর তেজস্বিনী নারীত্বের আদর্শ।
আধ্যাত্মিকতা ও রণনীতি
নেতাজী তাঁর সাথে সবসময় একটি ছোট গীতা এবং বিবেকানন্দের ছবি রাখতেন। যুদ্ধের চরম উত্তেজনার মাঝেও তিনি ধ্যানে বসতেন। তাঁর কাছে যুদ্ধ ছিল এক ধরণের ‘সেবা’—দেশের মানুষের জন্য চরম আত্মত্যাগ। বিবেকানন্দের ‘Practical Vedanta’ বা ব্যবহারিক বেদান্তকে তিনি যুদ্ধের ময়দানে প্রয়োগ করেছিলেন, যেখানে দেশমাতৃকার সেবা করাই ছিল পরম উপাসনা।
নেতাজী যখন সিঙ্গাপুরে আই.এন.এ-র দায়িত্ব নেন, তখন তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং প্রায়ই গভীর রাতে সেখানে গিয়ে ধ্যান করতেন। তিনি বলতেন, স্বামীজীর আদর্শই তাঁকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে স্থির থাকতে সাহায্য করে।
স্বামী বিবেকানন্দের যে বাণীগুলো নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং যেগুলি তিনি তাঁর চিঠিপত্রে বা জনসভায় প্রায়ই উদ্ধৃত করতেন
“অভীঃ” (ভয়হীনতা)
স্বামীজীর এই একটি শব্দ নেতাজীর জীবনের মূলমন্ত্র ছিল। নেতাজী বলতেন, বিবেকানন্দ আমাদের শিখিয়েছেন প্রতিকূলতার মুখে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে।
“বীরভোগ্যা বসুন্ধরা”
অর্থাৎ, এই পৃথিবী বীরদের ভোগ করার জন্য। নেতাজী বিশ্বাস করতেন, আপস করে নয়, বরং বীরত্বের মাধ্যমেই স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হবে।
Netaji Subhas Chandra Bose https://t.co/Gad9TJqjKR#netaji #netajisubhaschandrabose #bose #gumnaamibaba #bengalliberty pic.twitter.com/2BA6ucnD9P
— Bengal Liberty (@bengalliberty1) February 9, 2026
“মানুষ গড়ার ধর্ম” (Man-making Religion)
বিবেকানন্দের এই দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়েই নেতাজী বলতেন, “ভারতের এমন এক আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণ প্রয়োজন যা মানুষকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করবে।”
“ভারতবাসী আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ”
বিবেকানন্দের ‘বর্তমান ভারত’ প্রবন্ধের এই অংশটি নেতাজীর হৃদয়ের খুব কাছের ছিল। বিশেষ করে— “মুচি মেথর তোমার ভাই, ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ”— এই বাণীটি আই.এন.এ-র মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে তাঁকে অনুপ্রাণিত করত।

“উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত”
(ওঠো, জাগো এবং লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত থেমো না)। এই উপনিষদীয় বাণীটি যা বিবেকানন্দ জনপ্রিয় করেছিলেন, নেতাজী তাঁর তরুণ অনুগামীদের উজ্জীবিত করতে বারবার ব্যবহার করতেন।
“একটি আদর্শের জন্য একটি জীবন”
স্বামীজী বলতেন, একটি মহান আদর্শকে গ্রহণ করো এবং সেই চিন্তাকেই তোমার জীবন বানিয়ে ফেলো। নেতাজীর কাছে সেই আদর্শ ছিল ‘ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা’।
নেতাজী মনে করতেন, স্বামীজীর বাণীগুলি কেবল ধর্মীয় পাঠ নয়, বরং পরাধীন জাতির জন্য এক একটি ‘বারুদ’।
নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এবং স্বামী বিবেকানন্দ—একজন কর্মের দ্বারা এবং অন্যজন বাণীর দ্বারা ভারতকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নেতাজীর জীবন ছিল বিবেকানন্দের দর্শনেরই এক মূর্ত প্রতিফলন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই দুই মহামানবের সংযোগ সূত্রটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি, কারণ তাঁদের সম্মিলিত আদর্শই পারে এক ‘উন্নত ভারত’ গড়ে তুলতে।
