Bangladesh Budget 2026
Bengal Liberty, নয়ন বিশ্বাস রকি, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সমাজসেবক ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কর্মী:
ভাবছেন বাজারের খরচ (Bangladesh Budget 2026) বেড়েছে, সন্তানের শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে, চিকিৎসার বিলও কম নয়। ঠিক এই সময়েই টেলিভিশনের পর্দায় দেখলেন নতুন বাজেট। সেখানে কর ছাড়ের ঘোষণা আছে, মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি আছে, কর্মসংস্থানের কথা আছে, এমনকি আগামী দশকে দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার স্বপ্নও আছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে—এসব কি সত্যিই সহজ হবে?

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে এই প্রশ্নের প্রেক্ষাপটেই দেখতে হবে। কারণ বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার প্রতিফলন। দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় এসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার যে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট দিয়েছে, সেখানে উচ্চাভিলাষের অভাব নেই। কিন্তু বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় স্বপ্নের আকার দিয়ে নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতা দিয়ে।
নতুন বাজেটের দর্শন ও লক্ষ্য (Bangladesh Budget 2026)
সরকার এই বাজেটকে নাম দিয়েছে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’। নামের মধ্যেই একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, পরিবেশ ও সুশাসন—এসব খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে এক ধরনের কাঠামোগত পুনর্গঠনের রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে।

আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেবল কারখানা বা কৃষিক্ষেত্র থেকে আসে না; তা আসে মেধা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং সংস্কৃতিনির্ভর শিল্প থেকেও। তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে যায়—লক্ষ্য নির্ধারণ তুলনামূলক সহজ হলেও, তা অর্জনের রোডম্যাপ কতটা স্পষ্ট?
আয়ের উৎস ও রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ (Bangladesh Budget 2026)
যে কোনো বাজেটের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—টাকা কোথা থেকে আসবে? সরকার আগামী অর্থবছরে বিপুল ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে, যার ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে একদিকে যেমন রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে, অন্যদিকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে।

সমস্যা হলো, বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরে রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। প্রায় প্রতি বছরই লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব আদায়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফারাক দেখা গেছে। এবারও করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি আমরা বহু বছর ধরেই শুনে আসছি। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের করব্যবস্থা এখনও সীমিত সংখ্যক মানুষের ওপর নির্ভরশীল এবং নতুন করদাতা যুক্ত করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। ফলে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য অর্জন করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
বৈদেশিক ঋণ ও ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি (Bangladesh Budget 2026)
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈদেশিক ঋণ। নতুন অর্থবছরে বিদেশি ঋণপ্রাপ্তির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু বৈদেশিক অর্থায়ন এখন আর কেবল অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় নয়—এটি সংস্কার, সুশাসন ও নীতিগত বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে ঋণ পাওয়ার পরিকল্পনা করা সহজ হলেও বাস্তবে সেই অর্থ সময়মতো পাওয়া মোটেও সহজ নয়।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গাগুলোর একটি হলো ব্যাংক খাত। খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং আস্থাহীনতা—সব মিলিয়ে এই খাত এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেনি। এই অবস্থায় সরকার যদি ঘাটতি মেটাতে ব্যাপক হারে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তবে একটি পরিচিত ঝুঁকি সামনে আসবে—যা ‘ক্রাউডিং আউট’ বা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অর্থ সংকট তৈরি করবে। সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, বিনিয়োগ কমে যায় এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। অথচ এই বাজেটের অন্যতম মূল লক্ষ্যই হচ্ছে বিনিয়োগনির্ভর কর্মসংস্থান। সুতরাং, লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা এখন সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
কর ছাড় ও ভবিষ্যৎমুখী কিছু ইতিবাচক দিক (Bangladesh Budget 2026)
অবশ্য এই বাজেটের কিছু আলোচিত ও ইতিবাচক দিকও রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো কর ছাড়। ব্যক্তিগত আয়করে সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিয়ে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ফ্রিল্যান্সার, স্টার্টআপ ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যের ওপর কর কমানো এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্তগুলো নিঃসন্দেহে ভবিষ্যৎমুখী ও প্রশংসনীয়।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও বাজারের বাস্তবতা (Bangladesh Budget 2026)
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশের সাধারণ মানুষ তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় মানুষের ধৈর্য অনেকটাই কমে এসেছে। এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের সবচেয়ে বড় সূচক জিডিপি (GDP) নয়, বরং বাজারের চাল-ডাল-তেল, সন্তানের চাকরি এবং চিকিৎসার খরচ। তারা জানতে চায়—মূল্যস্ফীতি কি আসলেও কমবে? নতুন কর্মসংস্থান কি তৈরি হবে? ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কি আস্থা ফিরবে? ব্যবসা করা কি সহজ হবে? বাজেটের সফলতা শেষ পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তর মেলার ওপরই নির্ভর করবে।
প্রস্তাবিত বাজেটের নেতিবাচক দিক ও উদ্বেগ (Bangladesh Budget 2026)
প্রস্তাবিত বাজেট দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রণয়ন করা হলেও এর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক দিক রয়েছে, যা অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দেশের বিদ্যমান সংকটগুলোর প্রেক্ষাপটে বাজেটের কিছু সীমাবদ্ধতা অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে:

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অস্পষ্টতা: বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও সুস্পষ্ট পদক্ষেপের অভাব লক্ষ্য করা যায়। বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী উদ্যোগের অভাবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।
মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা: বাজেটে পরোক্ষ কর, ভ্যাট এবং বিভিন্ন সেবার ওপর কর বৃদ্ধির কারণে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ধনী শ্রেণির তুলনায় মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষ এই করের প্রভাব বেশি অনুভব করবে, যা আয় বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব: দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। শিল্পায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (SME) উন্নয়ন এবং দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচিতে আরও বেশি বরাদ্দ ও সুস্পষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল।
বিশাল বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপ: বাজেট ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। এর ফলে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ বাড়বে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের একটি বড় অংশ ঋণসেবাতেই চলে যাবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ: একটি উন্নয়নশীল দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির হার প্রত্যাশিত নয়।
কৃষি খাতের সীমাবদ্ধতা: উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সার ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কারণে কৃষকরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। বাজেটে কৃষকদের জন্য আরও বেশি ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
কালো টাকা ও কর নৈতিকতা: কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বা কর ছাড়সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে তা সৎ করদাতাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে কর সংস্কৃতিকে দুর্বল করবে।
সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার অপর্যাপ্ততা: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হলেও মূল্যস্ফীতির তুলনায় ভাতার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত, যা দরিদ্র ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

প্রতিশ্রুতির চেয়ে ফলাফলের প্রত্যাশা (Bangladesh Budget 2026)
সবশেষে বলা যায়, বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েই মূল প্রশ্নটি থেকে যায়। অতীতে দেখা গেছে, অনেক উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো সম্পন্ন হয়নি এবং বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি, অপচয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা বাজেট বাস্তবায়নের বড় বাধা। এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আসলে স্বপ্ন দেখার মধ্যে কোনো দোষ নেই। রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে বড় স্বপ্ন দেখতেই হয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, স্বপ্ন তখনই শক্তিতে পরিণত হয় যখন তার সঙ্গে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা যুক্ত হয়। দেশের মানুষ বহু বছর ধরে নানা প্রতিশ্রুতি শুনেছে। এখন তারা প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব ফলাফল দেখতে বেশি আগ্রহী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে হয়—‘মানুষ আর মোহের তরঙ্গে ভাসতে চায় না। তারা বাস্তব পরিবর্তনচায়।’
আরও পড়ুন:
বিএনপি সরকারের বাজেটে গরিবের কোন লাভ নেই, জিনিসপত্রের দাম কমবে না বরং বাড়বে


