Subhas Chandra Bose
Bengal liberty: সম্প্রতি নেতাজির (Netaji Subhash Chandra Bose) স্বঘোষিত কন্যা অর্থনীতিবিদ ডক্টর অনিতা পাফ দেশবাসীর কাছে নেতাজির মিথ্যা চিতাভস্ম জাপানের রেনকোজি মন্দির থেকে ভারতে এনে তাইওয়ানে নেতাজির বিমান দুর্ঘটনার (Flight Accident) মিথ্যা রটনাকে মান্যতা দিতে আর্জি জানিয়েছেন। নেতাজি প্রোপৌত্র চন্দ্র বসু দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে (PM Narendra Modi) চিঠি লিখে এই দাবি পূরণের আর্জি জানিয়েছেন। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল, বৃহস্পতিবার নেতাজি গবেষক সৈকত নিয়োগী এবং লেখক সৌমব্রত দাশগুপ্ত একটি জনসমাবেশের আয়োজন করেন। যেখানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং বিবেকানন্দ গবেষক তরুণ গোস্বামী, পবিত্র মোহন রায় পুত্র নেতাজি অনুগামী রণেন্দ্র মোহন রায়, লেখক বিপ্লব রায় এবং নেতাজির ভ্রাতুষ্পুত্র অশোকনাথ বসুর দুই কন্যা জয়ন্তী রক্ষিত এবং তাপসী ঘোষ।
সমস্ত নেতাজি অনুগামী সহ প্রত্যেকের দাবি ছিল, মুখার্জি কমিশন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছিল, “নেতাজির বিমান দুর্ঘটনা” মিথ্যা। সেই রিপোর্ট পার্লামেন্টে পেশ করে নেতাজি অন্তর্ধান রহস্যের স্থায়ী সমাধান ত্বরান্বিত করা হোক। তার পাশাপাশি ১৯৫৬ সালে তথাকথিত বিমান দুর্ঘটনাস্থলে তদন্ত করে তাইওয়ান সরকার রিপোর্টে জানিয়েছিল যে সেদিন কোন “বিমান দুর্ঘটনার প্রমাণই নেই।” সেই রিপোর্ট ও তৎসংক্রান্ত নথি কেন্দ্রীয় সরকার জনসম্মুখে আনুক। সারা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলির কাছে থাকা নেতাজি সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র প্রকাশের জন্য বিদেশ মন্ত্রকের কোন সক্রিয়তা এখনও পর্যন্ত মানুষের চোখে অধরা। দেশনায়কের স্বমহিমায় দেশে প্রত্যাবর্তন সম্ভব না হলেও তাঁর ইতিহাস সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রত্যেকে যেন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে পারে এই বিষয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রত্যেক নেতাজি অনুগামীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।
এ দিন উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের মধ্যে উপস্থিত সাংবাদিক তথা বিবেকানন্দ গবেষক তরুণ গোস্বামী তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, ‘এই যে নেতাজি “চিতাভস্ম”-কে ঘিরে যে ষড়যন্ত্র রটানো হচ্ছে তা বন্ধ করা হোক।’ তিনি উল্লেখ করেন, সর্বপ্রথমে নেতাজির অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় একজন ব্যক্তি স্বামী বিবেকানন্দের কথা। তিনি উত্থাপন করেন কেমন ভাবে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নিজের শৈশব বেলায় স্বামী বিবেকানন্দ সহ ঋষি অরবিন্দের পাশাপাশি ক্ষুদিরাম বসুর মতো মহামানবদের ভগবানের স্থানে বসিয়েছিলেন। ‘আমরা প্রত্যেকেই জানি এটাই সুভাষচন্দ্র বসু শৈশব বেলায় ছিলেন বড্ড দুরন্ত। তাঁকে এক জায়গায় ঠাই করে রাখা যেত না। কখনো সাত মাস আবার কখনো এক বছর তিনি বাড়ির বাইরে থাকতে সেখান থেকেই ছোট্ট সুভাষের বিবেকানন্দের প্রতি ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা প্রত্যেকটা মুহূর্তে বাড়তে থাকে। মাত্র ৪০ বছর বয়সে স্বামী বিবেকানন্দ যখন দেহত্যাগ করেন তখন সুভাষচন্দ্র বসু নেহাতই একজন সাড়ে পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশু কিন্তু তার এই বিবেকভক্তিই তাকে বানিয়ে তুলেছিল দেশের এক মহান নেতা।’
লেখক ও নেতাজি অনুগামী বিপ্লব রায় যখন তাঁর বক্তব্য উন্মোচন করেন তখন তিনি সর্বপ্রথম ভারত মাতার নাম নিয়ে এবং সেই দেশের মহাবীর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে উত্থাপন করেন “গুমনামি তত্ত্ব।” তিনি বলেন, ‘নেতাজির তথাকথিত ভুয়ো মৃত্যুর পর তিনি ছিলেন প্রথমে রাশিয়া, তারপর সোভিয়েত তারপর চীন, তারপর তিব্বতে তাঁর সন্ন্যাসের পথে এগিয়ে যাওয়ার কিছু কথা। তিনি চন্দ্র বসুর এই সিদ্ধান্তের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে বলেন, যেই বিমান দুর্ঘটনার কোনও অস্তিত্বই নেই সেটিকে সত্য প্রমাণ করে কি করতে চাইছেন বসু পরিবারের সদস্যরা তা এখনো প্রত্যেকের মস্তিষ্কে এক অধরা মরীচিকার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে চতুর্দিকে সর্বক্ষণ। তিনি আরও বলেন, এই যে তাইওয়ান ফাইলস বা তাইওয়ান রিপোর্ট যে সত্য তা মানুষের সামনে ফুটিয়ে তোলা উচিত এবং লীলা রায়,পবিত্র মোহন রায় সহ প্রমুখেরা যে সেই সময় এক সাধুর মুখোশহীন পথিকৃতি দেখতে সক্ষম হয়েছিলেন তার প্রমাণ সকলের সম্মুখে আনতে হবে।
নেতাজির ভ্রাতুষ্পুত্র অশোকনাথ বসুর কন্যা জয়ন্তী রক্ষিত তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে স্মরণ করে বলেন, ‘যে গুমনামী বাবা এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যে একই সঙ্গে যুক্ত তা তিনি জানতেন না। অনেক পরে একটি বইয়ের মাধ্যমে তিনি যখন জানতে পারেন যে গুমনামী বাবাই যে আদতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তখন তিনি কষ্টে ভেঙে পড়েন এবং বক্তব্যের মধ্যেও তাঁর চোখের অশ্রু স্বমহিমায় দৃশ্যমান ছিল। তাঁরই অশ্রু তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তাঁর শৈশবে।’ তিনি উত্থাপন করেন, তাঁর শৈশব কালে তাঁর পিতা অশোকনাথ বসুর মুখে তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অনেক গল্পই শুনেছিলেন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যকে কোন এক জায়গায় দোষারোপ করে তিনি সেই জীবনে তার প্রপিতার দর্শন পেলেন না সেটাই তার জীবনের সবথেকে বড় অনুশোচনার ভূমিকা পালন করবে।
নেতাজি আন্দোলনের যোদ্ধা জি দেবরাজন দক্ষিণ ভারত থেকে আসা একজন নেতাজি অনুগামী। তিনি উত্থাপন করেন, দক্ষিণ ভারতের মানুষদের নেতাজি সুভাষচন্দ্রের প্রতি ফুটে ওঠা ভালোবাসাকে। তাঁর বক্তব্য শুরু হয় মুথুরামলিঙ্গা থেবার এর কিছু বহু প্রাচীন সত্য কথার মাধ্যমে। থেবার বলেন, ‘তিনি ৯ মাস সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে একসাথে কাটিয়েছেন। এর জন্য তাঁকে নানা জায়গায় বদনামের শিকার হতে হয়। কেউ কেউ এটাও দাবি করে যে থেবার কেবলমাত্র ভোট কাটার জন্য এই পথটি বেছে নিয়েছে। কিন্তু রহস্যের মধ্যে যে কতটা সত্য লুকিয়ে ছিল তা প্রত্যেকটা মানুষের কাছে ছিল অজানা। আজও দক্ষিণ ভারতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ভগবানের মতো পুজো করা হয়। দক্ষিণের মানুষেরা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নাম অবলম্বনে নিজেদের নাম পর্যন্ত রাখতে প্রচন্ড স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। দেবরাজন আরও বলেন, ‘যে এই তাইওয়ান রিপোর্ট এর সত্যতা ভারত সরকারকে সবার সম্মুখে আনা উচিত এবং সুভাষচন্দ্র বসুকে তার যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া উচিত।’
বিপ্লবী পবিত্র মোহন রায়ের পুত্র এবং নেতাজি অনুগামী রণেন্দ্র মোহন রায় তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই নিজের পিতা পবিত্র মোহন রায়ের কথা উত্থাপন করে বলেন, যে একমাত্র তার পিতাই গুমনামী বাবা অথবা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর রহস্য সম্পর্কে এমন অনেক তথ্যই জানতেন যা উত্থাপন করলে হয়তো ভারতের সার্বভৌমত্ব একটু হলেও টলোমলো হয়ে যেতে পারে। তাই তিনি সেই বিষয়ে না গিয়ে এই নেতাজির চিতাভস্ম যে পুরোপুরি মিথ্যা যেটি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ফাইল সহ প্রত্যেক অনুগামীদের কাছে ফুটিয়ে তোলেন এবং ওড়িশার কটকে যেখানে নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের জন্মস্থান সেখানে তার পিতাকে কিভাবে ইংরেজ পুলিশদের মাধ্যমে অত্যাচারের শিকার হয়ে গ্রেফতার হতে হয় তাও বলেন। একইসঙ্গে তিনি তাইওয়ান ফাইল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। উপস্থিত সকল মানুষের কাছে তিনি পরিষ্কার করে দেন যে তৎকালীন শাহনাওয়াজ কমিটি, খোসলা কমিশন পুরোপুরি কংগ্রেসাধীন ছিল এবং শিশির বসুর সংগৃহীত নেতাজি জীবিত থাকার তথ্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর মাধ্যমে পুরোপুরিভাবে দাবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালেও এই সমস্ত নথির ওপরে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়নি ভারত সরকার। সবশেষে সাংবাদিকরা তাঁকে গুমনামি তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি তা পুরোপুরি এড়িয়ে যান। কোনওভাবেই মুখ খুলতে চান না। পরে বক্তব্য শেষ করে রওনা হন তাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যে।
আজাদ হিন্দ ফৌজের জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। তার পর ধীরে ধীরে সমাপ্তির দিকে যখন এগোচ্ছিল পুরো সম্মেলনটি, তখন কোথাও গিয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সেই প্রতিচ্ছবি প্রত্যেক নেতাজি অনুগামীর মনে এক জীবিত ভাবমূর্তি রূপে প্রকাশ পায়। এই সকল নেতাজি অনুগামীরা শপথ নেন, যে সুভাষচন্দ্র বসুকে বিচার দিতে তারা আইনের দ্বারস্থ হতেও দুবারও ভাববেন না। নেতাজি রহস্য উন্মোচনে ভারত সরকারকে একান্তই তাদের সাহায্য করতে হবে এই দাবি রেখে তারা এদিনের এই সম্মেলন শেষ করেন জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে।

