চায়ের ইতিহাস
Bengal Liberty, বিট্টু রায়চৌধুরী: ―‘‘চা খাব না আমরা? খাব না আমরা চা?’’
লকডাউনে নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া ‘চা কাকু’কে আজ আমরা প্রায় সকলেই চিনি। ভাইরাসের তাণ্ডবের মাঝে দাঁড়িয়ে বাঙালির চায়ের প্রতি টান কতটা হতে পারে, তা ‘চা কাকু’র ভাইরাল ভিডিও থেকেই স্পষ্ট (Tea History)। জল ছাড়া যেমন জীবনের কোনও অস্তিত্ব নেই, একইভাবে চা বাদ দিলে বাঙালির নাম-নিশান সম্পূর্ণ মিটে যাবে। আড্ডা, প্রেম, রাজনীতি সবেতেই চা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই তো কলকাতা-সহ দেশের সর্বত্রই গজিয়ে উঠেছে নানা আকারের চায়ের দোকান। ভোর হোক বা মধ্যরাত, কল্লোলিনীর পাশাপাশি দেশ জুড়ে চায়ের পরিষেবা মেলে ২৪×৭।
চা-টা’র ইতিহাস (Tea History)
ইতিহাস জানান দিচ্ছে, বৌদ্ধ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর বাঙালি হিসাবে প্রথম চা-পান করেছিলেন (Tea History)। ঐতিহাসিক দীনেশ চন্দ্র সেন বাংলার ইতিহাস নিয়ে বেশ কিছু লেখা লিখেছিলেন। তাঁরই রচিত পুস্তক ‘বৃহৎ বঙ্গ’-তে বাঙালির প্রথম চা-পানের বিষয়টা উল্লেখ রয়েছে। রাজবাড়ির অনুরোধে ৬০ বছর বয়সে অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে যান। দীনেশ চন্দ্র সেন লিখছেন, ‘‘এই স্থানে দীপঙ্কর রাজ প্রতিনিধির হাতে উপহার হিসাবে পাঠানো চা পান করিলেন। ইহাই বোধহয় বাঙালির প্রথম চা খাওয়া।’’

● ২,৭০০ খ্রিস্টপূর্বের কথা। তৎকালীন সময়ে চিনারা কেবলমাত্র ওষুধ হিসেবে চা সেবন করতেন। পরবর্তী সময়ে সমগ্র দেশে বৌদ্ধ ধর্মের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে চা অত্যন্ত সাধারণ পানীয়তে পরিণত হয়। এমন একটা পানীয়, যা পান করলে মানব দেহের ক্লান্তি, অসুস্থতা দূর হয়। জনপ্রিয়তা লাভের সঙ্গে সঙ্গে চা চিন থেকে ক্রমে এশিয়ার অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। যার নেপথ্যে ছিলেন বৌদ্ধভিক্ষুরা। তাঁদের হাত ধরেই চায়ের এই বিস্তার।
● পিছিয়ে ছিল না ইউরোপের দেশগুলোও। এশিয়া হয়ে চা পাড়ি দিল পর্তুগালে। বলা বাহুল্য, পর্তুগিজরাই প্রথম ইউরোপীয়, যাঁরা চা পান করেন। এরপর আবির্ভাব হয় ডাচদের। চা তাঁদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পানীয় হয়ে দাঁড়ায়। নেদারল্যান্ডসে চা পৌঁছানোর পর জার্মানি, ফ্রান্স, স্কেনডিনেভিয়া, ব্রিটেনে দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে এই উত্তেজক পানীয়। ফলে, ইউরোপে চা পান একটা অন্য মাত্রা পায় (Tea History)। বর্তমানে আমরা যে দুধ চা পান করে থাকি, তা কিন্তু ইউরোপীয়দের আমদানি। তবে চায়ে চিনি মেশানোর প্রচলন প্রথম শুরু করেন ব্রিটিশরা। ‘টি টাইম’ ধারণার সূত্রপাত এই ইউরোপ থেকেই শুরু হয়েছিল। ১৬৬২ সালে দ্বিতীয় কিং চার্লস বিবাহ করেন ক্যাথরিনকে। চা-পান এবং আড্ডা ক্যাথরিন কাছে অন্যতম নেশা এবং ভালোবাসা। সেই কারণে তারই উদ্যোগেই ‘টি টাইম’-এর প্রচলন হয়।
● ভারতে চায়ের অস্তিত্ব বহুযুগ আগেই মিলেছে। তবে সেটা চিনের আগে, না-পরে, সেটা জানা নেই। তবে, প্রথমদিকে অসমীয়রা চা পাতা সব্জি হিসাবে খেতেন। বিষয়টা ব্রিটিশ অভিযাত্রী রবার্ট ব্রুসের কানে আসে (Tea History)। বিষয়টা খতিয়ে দেখতে অসমে গিয়ে হাজির হন তিনি। অসম যাত্রা শেষে কলকাতা ফেরার পথে ব্রুস কিছু চা পাতা, বীজ এবং চারাগাছ গবেষণার জন্য নিয়ে আসেন। যদিও বিজ্ঞানীরা চিনের সঙ্গে অসমের চা-পাতার কোনও সাদৃশ্য দেখতে পেলেন না। ব্রিটিশদের লক্ষ্য ছিল, গোটা বিশ্ব জুড়ে কেবলমাত্র তারাই চায়ের উৎপাদন এবং আমদানির বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করবে। সেই কারণে তাঁরা তৈরি করলেন ‘ইন্ডিয়া টি কমিটি’। যদিও, অসমের চা নিয়ে তারা কোনওভাবেই আশাবাদী ছিলেন না। ফলে, চায়ের জন্য তাদের চিন এবং নেদারল্যান্ডসের ওপরই আস্থা রাখতে হয়েছিল।

● ১৮৪৮ সালে স্কটল্যান্ডের উদ্ভিদবিদ রবার্ট ফরচুন চিন যাত্রা করলেন। ভারতে ফেয়ার সময় সঙ্গে করে নিয়ে এলেন চা পাতা, গাছ, বীজ এবং চা উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য। এরপর সংশ্লিষ্ট চারাগাছগুলো দার্জিলিং, অসমে রোপণ করা করলেন। দেখা গেল, দার্জিলিংয়ে চিন থেকে আনা চা-গাছগুলো বেঁচে গেলেও অসমের ক্ষেত্রে সাফল্য আসেনি। এখান থেকেই চিন এবং অসমে গজিয়ে ওঠা চায়ের মধ্যে ফারাক ধরতে পারেন গবেষকরা (Tea History)।
অসম চা একটা পৃথক পরিচয় বহন করল। ব্রিটিশদের এই খোঁজ সাফল্যের মুখ দেখতেই দক্ষিণের নীলগিরি পাহাড় এবং হিমাচল প্রদেশের কাংরা ভ্যালিতে চা-গাছ রোপন করা হ’ল। এই সময় ৮০ জন চিনা ভারতের চা-বাগানগুলোতে কাজ করতে শুরু করলেন। গোটা বিশ্বে চা উৎপাদনের ওপর নিজেদের দখল পেতে ব্রিটিশরা টানা ৫০ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে। ফল স্বরূপ, ১৯০০ সালে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন কিলোগ্রাম চা ভারত থেকে ইংল্যান্ডের রফতানি হয়। পরে দেশ জুড়ে রেল পরিষেবা চালু হ’তেই ভারত জুড়ে চা ছড়িয়ে পড়ে। স্টেশনে স্টেশনে চায়ের দোকান খুলতে শুরু করে। অন্যদিকে, ব্রিটিশদের এই বাণিজ্যিক কৌশলে চিনের চা-ব্যবসা কার্যত লাটে উঠে যায়।
● ১৯৪০ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সময় চা-এর ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই সময় চা নিয়ে নানা বিজ্ঞাপন কাগজে ছাপা হ’ত। যেখানে লেখা থাকত, ‘১০০% স্বদেশী।’ বর্তমানে শুধু ভারতই নয়, চায়ের প্রবল চাহিদা জাপান, চিন, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে বিশেষভাবে লক্ষণীয় (Tea History)।
আরও পড়ুন: পুরুষ হয়েও ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এ ভাগ! সরকারি স্ক্রুটিনিতে ধরা পড়ে শ্রীঘরে বহরমপুরের ব্যবসায়ী
চায়ের সুবাস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও রীতিমতো নেশায় ফেলে দিয়েছিল। তাই তো কবিগুরু লিখে ফেললেন―
‘‘হায় হায় হায় দিন চলি যায়।
চা-স্পৃহ চঞ্চল চাতকদল চল’ চল’ চল’ হে।
টগ’বগ’-উচ্ছ্বল কাথলিতল-জল কল’কল’হে।
এল চীনগগন হতে পূর্বপবনস্রোতে শ্যামলরসধরপুঞ্জ।’’

